স্থবির অর্থনীতি নিয়ে নতুন সরকারের সামনে কঠিন পুনরুদ্ধার চ্যালেঞ্জ

প্রতিনিধি
নিজস্ব প্রতিবেদক
Thumbnail image
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ অস্থিরতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগে স্থবিরতা—এই তিন মারাত্মক চাপে অন্তর্বর্তী সরকার যে অর্থনীতি পেয়েছিল, তা ছিল কার্যত গতিহীন।

১৫ মাসের মধ্যে কিছু স্থিতিশীলতা ফিরলেও সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি এখনো দুর্বল। ফলে নির্বাচনের পর দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকারও একই দুরবস্থার অর্থনীতির মুখোমুখি হবে।

বিনিয়োগে দীর্ঘ মন্দা, অর্থনীতি থেকে উধাও গতি

দেশে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগে। জ্বালানি ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা, উচ্চ সুদহার, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, নিম্ন মজুরি—এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলোর পাশাপাশি সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে নষ্ট করেছে। এর প্রভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কম, কর্মসংস্থান নেই, ভোক্তাশক্তি দুর্বল।

দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি—বাংলাদেশে ৮%–এর বেশি

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী অক্টোবর মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.১৭ শতাংশ—দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপ—কেউই এখন আর এ মাত্রার মূল্যস্ফীতির মুখে নেই।
মানুষের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ব্যবধান বাড়ায় দারিদ্র্যও বাড়ছে। বেসরকারি জরিপে দেশে দারিদ্র্যের হার ২৮ শতাংশের কাছাকাছি, যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি।

সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছু অগ্রগতি

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে—

  • রপ্তানি আয় শুরুর দিকে বাড়লেও আবার কমেছে
  • প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি
  • ডলারের দর বাজারভিত্তিক হওয়ার পথে
  • বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন থেমেছে
  • বিদেশি বিনিয়োগ কিছুটা বেড়েছে

তবে আমদানি কমে যাওয়ায় ভারসাম্য হালকা পক্ষে থাকলেও অর্থনীতিতে প্রকৃত চাঙ্গাভাব তৈরি হয়নি।

মানুষের আস্থা কমছে, মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনাও ক্ষীণ

সাধারণ মানুষের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত মূল্যস্ফীতি কমার কোনো লক্ষণ নেই। সরকারের ব্যয় বাড়ছে, কৃচ্ছ্রসাধনের ঘোষণা বাস্তবে পালন হচ্ছে না।
বড় বহর নিয়ে বিদেশ সফর, অপরিকল্পিত ব্যয়, ব্যয়বহুল প্রকল্প—এসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে চাকরির সংকট, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা এবং বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। ফলে আস্থাহীনতা আরও গভীর হচ্ছে।

সরকারি ঋণ বেড়েছে, বেসরকারি খাতে ঋণ সংকোচন

ব্যাংকিং খাতের দুই গুরুত্বপূর্ণ সূচকে এখন বড় বৈপরীত্য—

  • সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন ২৭.২২%
  • বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে ৬.২৯%

অর্থাৎ সরকার ব্যাংক থেকে অতি মাত্রায় ঋণ নিচ্ছে, আর উদ্যোক্তাদের ঋণ সংকুচিত হচ্ছে।
এই ধারা বজায় থাকলে বিনিয়োগ আরও কমবে, কর্মসংস্থানও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

এডিপি বাস্তবায়ন ধীর, গ্রামীণ অর্থনীতি স্থবির

চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৮.৩৩%
এডিপিতে গতি না থাকায়—

  • নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না
  • অবকাঠামো উন্নয়ন মন্থর
  • গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে না

খেলাপি ঋণে ভয়াবহ অবস্থা—এশিয়ায় শীর্ষে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাংক খাতের প্রকৃত খেলাপি ঋণের হার ২৮%–এর বেশি, যা এশিয়ায় সর্বোচ্চ।
সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে কিছু ব্যাংক খেলাপি পুনর্গঠনের সুপারিশ মানছে না—এমন অভিযোগও উঠেছে।
৫টি ব্যাংক একীভূত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নও কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে।

নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

সব তথ্যই বলছে, নতুন সরকার যে অর্থনীতি পাবে তা—

  • গতিহীন
  • বিনিয়োগবিমুখ
  • ব্যাংকিং সংকটে ভারাক্রান্ত
  • উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ক্লিষ্ট

তবে সামষ্টিক কিছু সূচক স্থিতিশীল থাকায় পুনরুদ্ধারের সুযোগ আছে। এর জন্য জরুরি—

  • অস্থিরতা কমানো
  • বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি
  • ব্যাংক খাত সংস্কার
  • রাজস্ব আয় বাড়ানো
  • রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি
  • ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখা

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

অর্থনীতি নিয়ে আরও পড়ুন

দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন জমে থাকা উদ্বেগটির বাস্তব রূপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখন অচল বা খেলাপি

৪ দিন আগে

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে গত অক্টোবরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর আমদানিকৃত পণ্য খালাস ও সরবরাহব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। গুদাম পুড়ে যাওয়ার পর অস্থায়ী ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করলেও তা পর্যাপ্ত না হওয়ায় এখনো শৃঙ্খলা ফেরেনি।

৫ দিন আগে

দীর্ঘ অস্থিরতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগে স্থবিরতা—এই তিন মারাত্মক চাপে অন্তর্বর্তী সরকার যে অর্থনীতি পেয়েছিল, তা ছিল কার্যত গতিহীন

৬ দিন আগে

নীলফামারীতে উত্তরা ইপিজেড চালুর পর এলাকায় জীবনে নতুন গতি এসেছিল। কিন্তু সম্প্রতি অদৃশ্য শক্তির উস্কানিতে ইপিজেডে অস্থিরতা বাড়ছে, অনিশ্চয়তায় পড়েছে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিকের জীবিকা। শ্রমিক অসন্তোষের জেরে একই দিনে চারটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও আবারও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে

৭ দিন আগে