মো. আমিরুজ্জামান (সৈয়দপুর) নীলফামারী>
নীলফামারীর সৈয়দপুরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। আগরবাতি, মশার কয়েল, সাবান, ট্রাঙ্ক, স্যুটকেস, চিপস, মোমবাতি ও বিভিন্ন কারুপণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে হাজারো নারী স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন জেলাতেও সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই দশক ধরে সৈয়দপুরে আগরবাতি উৎপাদনের প্রচলন রয়েছে। বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় অর্ধশত কারখানা এবং অসংখ্য পারিবারিক উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে শহরের ২২টি বিহারি ক্যাম্পসহ বিভিন্ন মহল্লার প্রায় ১০ হাজার নারী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি আগরবাতি তৈরি করে তারা পরিবারের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থারও উন্নতি করছেন।
আগরবাতি তৈরিতে কয়লার গুঁড়া, কাঠের ভুসি ও বিজলার ছালের গুঁড়া ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট অনুপাতে এসব উপকরণ মিশিয়ে মেশিনে পেস্ট তৈরি করা হয়। পরে সেই মিশ্রণ কাঠির ওপর বসিয়ে আগরবাতি প্রস্তুত করা হয়। রোদে শুকানোর পর সুগন্ধি সংযোজন করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্র্যান্ডে বাজারজাত করা হয়।
একসময় সম্পূর্ণ হাতে আগরবাতি তৈরি হলেও বর্তমানে ছোট মেশিন ব্যবহারের ফলে উৎপাদন দ্রুত ও সহজ হয়েছে। এতে শ্রম কমেছে, উৎপাদন বেড়েছে এবং পণ্যের মানও উন্নত হয়েছে।
শহরের বাঁশবাড়ী এলাকার উদ্যোক্তা মাসুম বলেন, “আগে পুরো কাজ হাতেই করতে হতো। এখন মেশিন ব্যবহারের ফলে উৎপাদনের পরিমাণ ও মান দুটোই বেড়েছে। বাজারেও চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই শিল্পের মাধ্যমে অনেক নারী স্বাবলম্বী হচ্ছেন।”
সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের বিভিন্ন এলাকায় নারীরা বাড়িতেই আগরবাতি তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। উদ্যোক্তারা কাঁচামাল তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেন এবং প্রস্তুত পণ্য সংগ্রহ করে নিয়ে যান। একজন নারী প্রতিদিন কয়েক হাজার আগরবাতি তৈরি করে অতিরিক্ত আয় করছেন। এই আয় পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ এবং অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে শহরের গোলাহাট, মিস্ত্রিপাড়া, সাহেবপাড়া, বাবুপাড়া ও ইসলামবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় আগরবাতি শুকানোর দৃশ্যের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদেরও এ কাজে যুক্ত থাকতে দেখা গেছে। অনেক কারখানায় স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কারখানায় কর্মরত জলি, সুফিয়া, তারানা ও সুমিসহ অনেক নারী জানান, আগরবাতি তৈরির আয় তাদের পরিবারের আর্থিক সংকট কমিয়েছে। অনেকেই এই আয়ের মাধ্যমে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করছেন, আবার কেউ কেউ নিজের উদ্যোগে ছোট পরিসরে উৎপাদনও শুরু করেছেন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) নীলফামারী জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তা নূরেল হক জানান, আগরবাতি শিল্পের উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদানে বিসিক কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক প্রযুক্তি, সহজ ঋণ এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ আরও বাড়ানো গেলে সৈয়দপুরের আগরবাতি শিল্প দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় কুটিরশিল্পে পরিণত হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে।