শিরোনাম
৫ বছরে ৫২ মামলা

সৈয়দপুরে রেলসম্পত্তি দখলের মহোৎসব, বেদখলে শত শত একর জমি ও হাজারো কোয়ার্টার

সৈয়দপুরে রেলসম্পত্তি দখলের মহোৎসব, বেদখলে শত শত একর জমি ও হাজারো কোয়ার্টার

 

প্রতিনিধি, সৈয়দপুর (নীলফামারী)>
উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী রেলনগরী সৈয়দপুরে বাংলাদেশ রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ জমি ও আবাসন দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলের কবলে রয়েছে। সরকারি আইন ও নীতিমালা উপেক্ষা করে রেলওয়ের জমিতে বহুতল ভবন, মার্কেট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পাকা বসতি নির্মাণের পাশাপাশি প্রকাশ্যে বেচাকেনার অভিযোগও উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সৈয়দপুর উপজেলায় বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ৮০০ একর জমি রয়েছে। এর মধ্যে ১৮৭০ সালে প্রায় ১১০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা। অবশিষ্ট জমির মধ্যে রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন, কৃষিজমি, জলাশয় এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য সংরক্ষিত ভূমি।

রেলওয়ের তথ্যমতে, অব্যবহৃত সম্পদের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৫৫ একর কৃষিজমি, ২১ দশমিক ৩৮ একর জলাশয়, ১ একর বাণিজ্যিক জমি এবং ২৫ দশমিক ২৫ একর জমি পৌরসভার কাছে বরাদ্দ। তবে স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে প্রায় ৪২৭ একর রেলভূমি বেদখল হয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধু জমিই নয়, রেলওয়ের আবাসন ব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে বেদখলের শিকার। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত প্রায় ২ হাজার ৬৭০টি স্টাফ কোয়ার্টারের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি বর্তমানে অবৈধ দখলে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব কোয়ার্টারের অনেকগুলো অবৈধভাবে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে, আবার কিছু মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিক্রিও করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত পাঁচ বছরে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ৫২টি মামলা করা হলেও অধিকাংশ মামলার কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী দখলদার ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দখলমুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

'বাংলাদেশ রেলওয়ে ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২০' অনুযায়ী লিজকৃত জমিতে লিখিত অনুমতি ছাড়া একতলা কাঁচা বা সেমিপাকা স্থাপনা ছাড়া অন্য কোনো স্থায়ী বা বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ নেই। এছাড়া 'ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩'-এ সরকারি, বিশেষ করে রেলওয়ের জমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী উচ্ছেদ, লিজ বাতিল, গ্রেপ্তার, সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ খুবই সীমিত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি অফিস ও রেলের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে রেলভূমি দখল, অবৈধ বেচাকেনা এবং বহুতল স্থাপনা নির্মাণ চলছে। ফলে রেলের মূল্যবান সম্পত্তি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে গত ৮ জুন গোলাহাট এলাকায় রেলওয়ের জলাশয় ভরাট করে নির্মিত অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে রেল কর্তৃপক্ষ। পাকশী বিভাগের ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযানে রেলওয়ের জমিতে নির্মিত ৯টি পাকা ও আধাপাকা স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে নজরে আসে। এরপর রেলওয়ের জমিতে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয় এবং এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে দুই দিনের ঘোষিত অভিযানের পর বাস্তবে একদিনেই কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়।

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফী নুর মোহাম্মদ বলেন, "আগে রেলওয়ের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ছিল, এখন নেই। ফলে উচ্ছেদ অভিযান বা আইনগত ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হয়। দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। এতে বেদখল জমি উদ্ধারের কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।"

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর