শিপন হালদার>
দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দীর্ঘ ৩২ বছরের গৌরবোজ্জ্বল পথচলার পর ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে ব্যর্থ হয়েছে ব্যাংকটি। এক সময় যে ব্যাংকের তারল্য ছিল ঈর্ষণীয়, আজ তা টিকে আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ তারল্য সহায়তার ওপর ভর করে। চলমান এই অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার উপায়ই বা কী—তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকটের বীজ বপন শুরু ২০১৭ সালে। যখন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নেয়। সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ অডিট এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে যে, এস আলম গ্রুপ এবং তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে গেছে। এই ঋণের একটি বড় অংশই এখন খেলাপি বা মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে, যার ফলে ২০২৪ শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ৪ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্যাংকটি চরম তারল্য সংকটে পড়ে। গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিন নিট আমানত উত্তোলনের পরিমাণ ১২০০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বাধ্যতামূলক নগদ জমা (সিআরআর) সংরক্ষণ করতেও ব্যর্থ হয়। এই আতঙ্কিত আমানতকারীদের সামাল দিতে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক জুন ২০২৬-এ ইসলামী ব্যাংককে কয়েক দফায় বিশেষ তারল্য সহায়তা প্রদান করে, যার পরিমাণ মাত্র তিন দিনেই প্রায় ৬,৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতির যে চিত্র সামনে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নিরীক্ষক বা অডিটরদের মতে, ব্যাংকটির প্রভিশন বা সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৪,৬১৫ কোটি টাকায়। যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ ছাড় না থাকত, তবে ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিআরএআর) দাঁড়াত ঋণাত্মক ৪৮.৬৭ শতাংশে। অডিট রিপোর্টে আরও দেখা যায় যে, ব্যাংকটির মোট ১,৮৬,০৯৭ কোটি টাকার বিনিয়োগের মধ্যে ৯৪,৩২২ কোটি টাকাই শ্রেণীবদ্ধ বা খেলাপি হয়ে পড়েছে। এমনকি ব্যাংকটি দুর্বল কিছু ব্যাংকের (যেমন- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক) সাব-অর্ডিনেটেড বন্ডে ৮৪৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, যা ফেরত পাওয়া এখন অনিশ্চিত।
আস্থার সংকট কাটাতে প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের জুনে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেয়। এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করে একটি অভিজ্ঞ ও পেশাদার বোর্ড গঠন করা হয়েছে। আশার কথা হচ্ছে, ইসলামী ব্যাংক ধীরে ধীরে সংকট কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী:
১. আমানত বৃদ্ধি: ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকায়, যা এক বছরে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
২. রেমিট্যান্স প্রবাহ: টানা ১৮ বছর ধরে রেমিট্যান্স সংগ্রহে শীর্ষে থাকা ইসলামী ব্যাংক ২০২৫ সালেও প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স দেশে এনেছে।
৩. নগদ প্রবাহের উন্নতি: বর্তমান ব্যবস্থাপনা দাবি করছে যে, ব্যাংকের দৈনিক নগদ প্রবাহ বা ক্যাশ ফ্লো এখন ইতিবাচক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব বকেয়া পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে।
ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
১. খেলাপি ঋণ আদায় ও আইনি লড়াই: এস আলম গ্রুপের নামে বেনামে নেওয়া ঋণ উদ্ধারে অর্থ ঋণ আদালত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ইতোমধ্যে তাদের বিভিন্ন সম্পদ নিলামে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
২. স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা: ব্যাংকের অভ্যন্তরে কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো যাবে না এবং একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পেশাদার বোর্ড দ্বারা ব্যাংক পরিচালনা করতে হবে।
৩. প্রবেশন ঘাটতি পূরণ: কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রভিশন সংরক্ষণে কয়েক বছরের জন্য 'ডেফারেল' বা ছাড় দেওয়া হয়েছে [৫২]। এই সময়ের মধ্যে মুনাফা থেকে ঘাটতি পূরণ করার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
৪. প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন: গ্রাহক আস্থা ফেরাতে 'ইনোভেশন ও ডিজিটাইজেশন' স্লোগান নিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বাড়াতে হবে, যা ব্যাংকটি ইতোমধ্যে শুরু করেছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা: ব্যাংকটি সম্প্রতি অসাধু মহলের ছড়ানো গুজব ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নোটিশ জারি করেছে, যা গ্রাহকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে হওয়া বিপুল লুণ্ঠন ব্যাংকটিকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক বোর্ড পুনর্গঠন এবং তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে প্রকৃত ঘুরে দাঁড়ানো নির্ভর করবে খেলাপি ঋণ আদায়ে কতটা কঠোর হওয়া যায় এবং সাধারণ গ্রাহকদের মনে পুনরায় ব্যাংকিং নিরাপত্তার বিশ্বাস কতটা দৃঢ়ভাবে গেঁথে দেওয়া যায় তার ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারি এবং নতুন পর্ষদের দূরদর্শী নেতৃত্বই পারে ইসলামী ব্যাংকের পুনরুত্থান ঘটাতে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক