শিরোনাম
এনবিআরে প্রমোশন কেলেঙ্কারি

ভাতিজাকে তালিকায় আনতেই তড়িঘড়ি পদোন্নতি? দুই কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ

ভাতিজাকে তালিকায় আনতেই তড়িঘড়ি পদোন্নতি? দুই কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের আপন ভাতিজাকে কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্যে পুরো পদোন্নতি প্রক্রিয়া তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে এই পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে ঘিরে বিপুল অর্থ লেনদেন, সিন্ডিকেট গঠন এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগও সামনে এসেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিসিএস কর একাডেমির ব্যক্তিগত সহকারী মো. লোকমান হোসেনকে কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে প্রশাসনিকভাবে দ্রুত পদোন্নতি কার্যক্রম শেষ করার চেষ্টা চলছে। এ কাজে কর অঞ্চল-১০-এর সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. আসাদুজ্জামান ভূঁইয়াসহ একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি করেছেন একাধিক কর্মচারী।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতির জন্য প্রায় ৩৮৫ জন কর্মচারীর কাছ থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে এসব যোগাযোগ ও সমন্বয় করা হয়েছে বলেও দাবি তাদের।

সূত্র জানায়, সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকায় মোট ৬৫১ জন থাকলেও এবার মাত্র ৩৮৫ জনকে পদোন্নতির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ অনেক যোগ্য কর্মচারী বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যানের ভাতিজা লোকমান হোসেনের সিরিয়াল নম্বর ৫০৫ হওয়া সত্ত্বেও তাকে পদোন্নতির আওতায় আনতেই তালিকাটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, এই উদ্দেশ্যেই পদোন্নতির সংখ্যা সীমিত করে পুরো প্রক্রিয়াটি সাজানো হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, মোট ৬৫১ জনের মধ্যে মাধ্যমিক পাস না করা এবং বিভাগীয় পরীক্ষায় অকৃতকার্য কয়েকজনও ছিলেন। তাদের বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সুবিধার্থে ৩৮৫ জনের একটি তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে বিভাগীয় পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার আগেই সিনিয়রিটি উপেক্ষা করে পদোন্নতির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, এনবিআর চেয়ারম্যানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ আগামী ২৮ জুন শেষ হওয়ার আগেই পদোন্নতি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রশাসনিকভাবে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। সাধারণত বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সিদ্ধান্তের পর ফাইল আইআরডিতে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগলেও এবার অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পরীক্ষা না হওয়ায় যোগ্য কর্মচারীরা পদোন্নতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

কর অঞ্চল-২-এর এক কর্মচারী জানান, ১৬ বছরের চাকরি জীবনে তিনি মাত্র দুইবার বিভাগীয় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে দেখেছেন। কর অঞ্চল-৫-এর আরেক কর্মচারী বলেন, নিয়মিত পরীক্ষা না হওয়ায় বহু কর্মকর্তা-কর্মচারী বছরের পর বছর পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর বিভাগীয় পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলেও সাত মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। সর্বশেষ বিভাগীয় পরীক্ষা হয়েছিল ২০২৩ সালে। অনেক কর্মচারী পুনঃপরীক্ষার আবেদন করলেও কোনো সাড়া পাননি। অথচ তাদের সুযোগ না দিয়েই পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

চলতি বছরের ২ মার্চ প্রকাশিত সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকার পর নতুন করে শুরু হওয়া পদোন্নতি কার্যক্রমে অসন্তোষ আরও বেড়েছে। কর্মচারীদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট বিভিন্ন কর অঞ্চলে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর অনুবিভাগে দীর্ঘদিন ধরেই পদোন্নি বঞ্চনা, গ্রুপিং ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ রয়েছে। অনেক কর্মচারী পুরো চাকরি জীবনে মাত্র একটি পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার কেউ কেউ কোনো পদোন্নতি ছাড়াই অবসরে গেছেন বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের।

অভিযোগের বিষয়ে বিসিএস কর একাডেমির ব্যক্তিগত সহকারী মো. লোকমান হোসেন বলেন, “এনবিআর চেয়ারম্যান আমার চাচা—এটি সত্য। তবে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলো প্রকাশের আগে অবশ্যই যাচাই-বাছাই করে দেখবেন।”

কর অঞ্চল-১০-এর সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, “লোকমান হোসেন আমার বন্ধু। সে কারণে অনেকে নানা কথা বলতে পারে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।”

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন। তাদের দাবি, অতীতে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর অনেকের চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটেছে। ফলে এখনো তারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।

এদিকে এনবিআরের অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে, চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নেওয়া বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে তার মেয়াদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির ও লবিং চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর