রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ১২ বছরের ছেলেকে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের দাবি, মাদক সেবনের বিষয়টি দেখে ফেলায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে ঘটনাটি জানাজানি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় একে একে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রোববার (২৩ আগস্ট) ভোরে তাদের আটক করা হয়। পরে দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক দুজন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর দোতলা বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া একটি ভবনের ছাদ দিয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ তার বাড়ির ছাদে ওঠে। সেখানে তারা মাদক সেবন করছিল। এ সময় গণপতি চক্রবর্তী তাদের দেখে ফেলেন এবং বকাঝকা করেন। বিষয়টি প্রকাশ হয়ে গেলে পুলিশ বা অন্য কারও কাছে খবর পৌঁছে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এরপর গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। বিষয়টি টের পেয়ে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা ছাদে গেলে তাকেও হত্যা করা হয়। পরে ধস্তাধস্তির শব্দে মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী সেখানে গেলে তাকেও হত্যা করা হয়।
পরিবারের ১২ বছরের ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী ঘরে একা থাকায় তাকেও হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘাতকদের আশঙ্কা ছিল, শিশুটি তাদের চিনতে পারে এবং পরবর্তীতে হত্যাকাণ্ডের তথ্য প্রকাশ করতে পারে। পরে তাকেও হত্যা করা হয়।
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পরও ওই দুই যুবক বাড়িতে অবস্থান করে। তারা বাড়ির বিভিন্ন কক্ষ তল্লাশি করে স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান সামগ্রী নেয়। পরে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে তারা সেখান থেকে চলে যায়।
এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকেই পরিবারের সদস্যদের বাইরে দেখা যাচ্ছিল না। বাড়িটিও তালাবদ্ধ ছিল। শনিবার রাতে বাড়ি থেকে দুর্গন্ধ বের হলে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে নিহত প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বাড়ির তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ জানায়, গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ বাড়ির ছাদ থেকে উদ্ধার করা হয়। তার স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগমনীকে পাওয়া যায় ছাদে ওঠার সিঁড়িতে। আর ছেলে প্রিয়মের মরদেহ ছিল একটি খাটের নিচে। বাড়ির বিভিন্ন আসবাবপত্র ও মালামাল ছিল এলোমেলো অবস্থায়।
নিহত গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি রংপুর সমবায় মার্কেটের একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে চিকিৎসাসেবা দিতেন। তার মেয়ে আগমনী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। আর ছেলে প্রিয়ম রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, আটক দুজনের বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না কিংবা এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
একই পরিবারের চার সদস্যের এমন মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে এলাকায় শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। মাদক সেবনের ঘটনা থেকে শুরু হয়ে কীভাবে একটি পরিবারের চারটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া হলো, তদন্তের মাধ্যমে এখন সেই রহস্যের পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের করার চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।