নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার কারণে বসতভিটা ও জীবিকা হারিয়ে সাতক্ষীরা শহরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শহরের প্রায় দুই লাখ বাসিন্দার মধ্যে আনুমানিক ৫০ হাজার নিম্ন আয়ের পথবাসী, ঝুপড়িবাসী ও বস্তিবাসী। তাঁদের বড় একটি অংশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরমুখী হয়েছেন। নিরাপদ আবাসন ও মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ৮ দফা দাবি জানিয়েছেন নাগরিক নেতারা।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টায় সাতক্ষীরা শহরের ম্যানগ্রোভ সভাঘরে বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক) আয়োজিত ‘সাতক্ষীরার নিম্ন আয়ের ভূমিহীন বস্তিবাসীর আবাসন সংকট সমাধানে করণীয়’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে এসব দাবি জানানো হয়।
গ্রীন কোয়ালিশন সাতক্ষীরার সভাপতি আবু আফফান রোজ বাবুর সভাপতিত্বে সংলাপে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন বারসিকের প্রোগ্রাম অফিসার গাজী মাহিদা মিজান।
ধারণাপত্রে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় সাতক্ষীরা দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে প্রতিবছর বহু মানুষ বসতভিটা ও জীবিকা হারিয়ে শহরমুখী হচ্ছেন। তাঁদের অনেকে বস্তি ও অনিরাপদ স্থানে বসতি গড়ে তুলছেন।
বক্তারা বলেন, বস্তিবাসীরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, গৃহস্থালি ও নির্মাণশ্রমসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত থেকে শহরের অর্থনীতি ও নাগরিক জীবন সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অথচ নগর পরিকল্পনায় তাঁদের প্রয়োজন যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না।
সংলাপে সাতক্ষীরা-শ্যামনগর সড়ক প্রশস্তকরণের সময় ২০২৪ সালে উচ্ছেদ হওয়া ইটাগাছা বস্তির ১০৪টি পরিবারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বক্তারা জানান, কোনো ধরনের পুনর্বাসন ছাড়াই এসব পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। এরপর থেকে অনেক পরিবার মানবেতর পরিবেশে বসবাস করছে।
নাগরিক নেতারা বলেন, অনিরাপদ পরিবেশে বসবাসের কারণে বস্তিবাসীরা নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। নিম্ন আয়ের মানুষের উপার্জনের একটি বড় অংশ চিকিৎসা ব্যয়ে চলে যায়। তাই আবাসনের পাশাপাশি তাঁদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
সংলাপে বক্তারা বলেন, দরিদ্র ও জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুচ্যুত মানুষকে বাদ দিয়ে টেকসই নগর উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দরিদ্রবান্ধব নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সংলাপে বক্তব্য দেন নাগরিক নেতা কল্যাণ ব্যানার্জি, পবিত্র মোহন দাশ, কিশোরী মোহন সরকার, মাধব চন্দ্র দত্ত, এম কামরুজ্জামান, মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জ্বল, গোলাম সরোয়ার, আলী নুর খান বাবুল, সিদ্দিকুর রহমান এবং বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শাহীন ইসলাম।
৮ দফা দাবি
সংলাপ থেকে উত্থাপিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—উচ্ছেদ হওয়া ১০৪টি পরিবারসহ দরিদ্র বস্তিবাসীর জন্য নিরাপদ ও দুর্যোগসহনশীল আবাসন নিশ্চিত করা; শহরের জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে নিরসন; সরকারি ভর্তুকিতে সুপেয় পানি, বিদ্যুৎ ও পয়োনিষ্কাশন সুবিধা দেওয়া; বস্তির ছেলে-মেয়েদের কারিগরি শিক্ষার আওতায় আনা; বিকল্প পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ বন্ধ করা; দরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা; সারা বছর ভর্তুকিমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ এবং পরিকল্পিত ও দরিদ্রবান্ধব নগর গড়ে তোলা।
বক্তারা জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপদ আবাসন, মৌলিক নাগরিক সুবিধা ও জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে সাতক্ষীরা শহরকে আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দুর্যোগসহনশীল নগর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।