শিরোনাম

জামালপুরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী-অভিভাবক

জামালপুরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী-অভিভাবক

জামালপুর শহরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের চলাচলের পথে দলবদ্ধ কিশোরদের আড্ডা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মারামারি ও নানা ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জামালপুর শহরে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের দলবদ্ধভাবে ঘোরাফেরা ও আড্ডা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের একটি অংশ নিজেদের মধ্যেও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ, আবাসিক এলাকা ও জনসমাগমস্থলে কিশোরদের দলবদ্ধ উপস্থিতি নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বেশি। সন্তানদের স্কুল-কলেজে যাতায়াতের সময় নিরাপত্তা নিয়েও অনেকে শঙ্কিত।

নতুন নয়, পুরোনো সমস্যারই পুনরাবৃত্তি
জামালপুরে কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা নতুন নয়। ২০২১ সালের জুনেও জেলার একটি ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। কয়েক বছর পরও একই ধরনের অভিযোগ ও উদ্বেগ সামনে আসায় কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে নেওয়া পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কিশোরদের একটি অংশ কেন অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে, কারা তাদের প্রভাবিত করছে এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারির ঘাটতি কোথায়—এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বাড়ছে উদ্বেগ
কিশোরদের মধ্যে দলবদ্ধতা ও সংঘাতের প্রবণতা তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। বিভিন্ন সময় বিরোধ, হুমকি বা সংঘাতের ভিডিও ও বার্তা অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে তা অন্যদের মধ্যেও উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রমাণ ও তদন্তের তথ্য যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিরোধে প্রয়োজন পরিবার-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-
পুলিশের সমন্বয়
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষক, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কিশোরদের অবসর সময়কে ইতিবাচক কাজে যুক্ত করতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পাঠাগার, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক কার্যক্রমের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। কোনো কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়লে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে তার পারিবারিক, শিক্ষাগত ও সামাজিক পরিবেশও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন নির্দেশিকাতেও শিশু-কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক চাপ ও পরিস্থিতির ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে শিশুদের ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়ায় বিশেষ সুরক্ষার বিধান রয়েছে।
নজরদারি বাড়ানোর দাবি
জামালপুরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি, অপরাধপ্রবণ এলাকায় টহল জোরদার এবং অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তবে কোনো কিশোরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে যাচাই-বাছাই ছাড়া ‘অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত না করার বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ, একটি কিশোরকে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা শুধু একটি পরিবারকে রক্ষা করে না; ভবিষ্যতে একটি সম্ভাব্য অপরাধচক্র গড়ে ওঠাও ঠেকাতে পারে।
নিরাপদ শহর চান অভিভাবকরা
অভিভাবকদের প্রত্যাশা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে নজরদারি বাড়ানো, কিশোরদের দলবদ্ধ সহিংসতা প্রতিরোধ এবং অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জামালপুরে কিশোর গ্যাং নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একই সঙ্গে একটি সামাজিক সমস্যাও। কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই তাদের ঝুঁকি চিহ্নিত করে পরিবার, শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে মূলধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কার্যকর পথ।

তানিয়া আক্তার 
জামালপুর জেলা 

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর