আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল কিংবা বৈদেশিক সহায়তার অপেক্ষায় না থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে মাঠে নেমেছে সাতক্ষীরার আশাশুনির শিক্ষার্থীরা। লবণাক্ততা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে থাকা সুন্দরবনসংলগ্ন এ উপজেলায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ হাজার ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ ও রোপণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে আশাশুনি উপজেলা মডেল মসজিদ মিলনায়তনে এ উপলক্ষে কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের হাতে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়। পরে উপজেলা পরিষদ চত্বরে বৃক্ষরোপণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়।
ইএসডিওর প্রকল্প পরিচালক শামসুল হক মৃধার সভাপতিত্বে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্যামানন্দ কুন্ডু।
অনুষ্ঠানে আশাশুনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শামীম আহমেদ খান, উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক হেদায়েতুল ইসলাম, উপজেলা জামায়াতের আমির আবু মুসা তারিকুজ্জামান তুষার, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আমিরুল ইসলাম, আশাশুনি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম, আশাশুনি সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আজহারুল ইসলাম মুকুল, ক্লাইমেট জাস্টিস ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক সাংবাদিক আমিনা বিলকিস ময়নাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা উপস্থিত ছিলেন।
জলবায়ু ঝুঁকিতে উপকূল
সুন্দরবনের প্রভাববলয়ের আশাশুনি উপজেলা দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অতিরিক্ত তাপমাত্রাসহ নানা জলবায়ু ঝুঁকির মুখে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাতেও এর প্রভাব পড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা করা গেলে স্থানীয় সবুজ আচ্ছাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মাটির ক্ষয় রোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রার প্রভাব কমাতে সহায়তা করতে পারে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় গড়ে ওঠা সবুজ বেষ্টনী ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
এখনই কার্যকর পদক্ষেপের তাগিদ
কর্মসূচির উদ্বোধনকালে ইউএনও শ্যামানন্দ কুন্ডু বলেন, উপকূলীয় এলাকায় উষ্ণতা ও লবণাক্ততা যে হারে বাড়ছে, তা মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগ প্রশংসনীয়।
তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষার্থীদের এমন ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা ও সুরক্ষা দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার অপেক্ষা নয়
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী রাকিব নুর, রাকিব আনোয়ার, আনন ও রফিকুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তাদের নিজেদের এলাকাতেই স্পষ্ট। লবণাক্ততা বাড়ছে, পরিবেশ রুক্ষ হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও রয়েছে। এসব মোকাবিলায় শুধু আন্তর্জাতিক সহায়তার অপেক্ষায় না থেকে স্থানীয়ভাবেই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের ভাষ্য, ৫ হাজার গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে আশাশুনিতে একটি সবুজ বলয় তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। গাছগুলো বড় হলে স্থানীয় পরিবেশে সবুজ আচ্ছাদন বাড়বে এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তারা আশা করছেন।
সুন্দরবনের সুরক্ষাবলয়ে সবুজ উদ্যোগ
সংশ্লিষ্টরা জানান, সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয় হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সুন্দরবন ও এর আশপাশের প্রতিবেশব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়ছে। ফলে শুধু সুন্দরবন রক্ষাই নয়, এর আশপাশের জনবসতিতেও পরিকল্পিতভাবে সবুজ আচ্ছাদন বাড়ানো জরুরি।
ক্লাইমেট জাস্টিস ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক সাংবাদিক আমিনা বিলকিস ময়না বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হলেও ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের এ কর্মসূচি জলবায়ু সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজনের একটি উদাহরণ হতে পারে।
ইএসডিওর প্রকল্প পরিচালক শামসুল হক মৃধা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ের উদ্যোগের গুরুত্ব অনেক। শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিচালনার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় তাদের দায়িত্বশীল করে তোলা সম্ভব।
শুধু রোপণ নয়, পরিচর্যাতেও গুরুত্ব
আয়োজকরা জানান, শুধু চারা বিতরণ বা রোপণ নয়, গাছগুলো যাতে টিকে থাকে সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের নিজ নিজ এলাকায় চারাগুলো রোপণের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণ একমাত্র সমাধান নয়। এর সঙ্গে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, দুর্যোগপ্রতিরোধী অবকাঠামো এবং জলবায়ু অভিযোজনের অন্যান্য কার্যক্রমও প্রয়োজন। তবে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ধারাবাহিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উপকূলের পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আশাশুনির এ উদ্যোগ তাই শুধু ৫ হাজার চারা রোপণের কর্মসূচি নয়; জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা সুন্দরবনসংলগ্ন একটি জনপদে নিজেদের পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় প্রজন্মের অংশগ্রহণেরও একটি বার্তা।