শিরোনাম
৯ মাসে ১১৯ বিয়ে ঠেকাল প্রশাসন, অঙ্গীকারের পরও গোপনে বিয়ের অভিযোগ

সাতক্ষীরায় বাল্যবিয়ের ঝুঁকি কাটছে না

সাতক্ষীরায় বাল্যবিয়ের ঝুঁকি কাটছে না

সাতক্ষীরায় বাল্যবিয়ের ঝুঁকি কাটছে না। প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে একের পর এক বিয়ে বন্ধ করা হলেও গোপনে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠছে। স্কুলে পড়ার বয়সেই অনেক কিশোরীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে উপকূলীয় শ্যামনগর ও আশাশুনির মতো এলাকায় দারিদ্র্য, লবণাক্ততা, কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্যোগ ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সামাজিক কুসংস্কার।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাতক্ষীরায় প্রায় ৭২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়ে যায়। উপজেলা পর্যায়েও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্যামনগর, কলারোয়া ও কালীগঞ্জে এ হার প্রায় ৬৩ শতাংশ এবং তালা, আশাশুনি, সাতক্ষীরা সদর ও দেবহাটায় প্রায় ৬২ শতাংশ।

তবে এসব পরিসংখ্যানের উৎস ও সময়কাল স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা জরুরি। জাতীয় পর্যায়ের বিবিএসের ২০১৯ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS)-তে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৫১ দশমিক ৪ শতাংশের ১৮ বছরের আগে প্রথম বিয়ের তথ্য পাওয়া যায়।

৯ মাসে ১১৯ বিয়ে ঠেকানো

জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাতক্ষীরায় ১১৯টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১৪৩টি। অর্থাৎ চলতি বছর ২৪টি কম বিয়ে বন্ধ হয়েছে।

তবে প্রশাসনের কাছে আসা এসব ঘটনাকে বাল্যবিয়ের পূর্ণ চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। কারণ অনেক বিয়ে গোপনে সম্পন্ন হয়। আবার কোথাও বিয়ে বন্ধ করার পরও পরবর্তী সময়ে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

একসঙ্গে ২৮ ছাত্রীর বিয়ের তথ্য

সম্প্রতি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শাল্যে আদর্শ দাখিল মাদ্রাসার অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির ১৬ ছাত্রীর বাল্যবিয়ের তথ্য সামনে আসে। ২৪ সেপ্টেম্বর তাদের মধ্যে ১৫ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্তের সামনে হাজির হন।

জেলা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সাকিবুর রহমান বাবলার অভিযোগের পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। শিক্ষার্থীদের ১৮ বছর বয়সের আগে শ্বশুরবাড়িতে না যাওয়া এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার নেওয়া হয়। অভিভাবকেরাও একই বিষয়ে লিখিত অঙ্গীকার করেন।

নথিপত্র যাচাই শেষে ইউএনও অর্ণব দত্ত জানান, অঙ্গীকার ভঙ্গ করে বিয়ে বা শ্বশুরবাড়িতে পাঠানোর চেষ্টা হলে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে ১০ সেপ্টেম্বর তালা উপজেলার ইসলামকাটি ইউনিয়ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির ১৩ ছাত্রীর বাল্যবিয়ের তথ্য পাওয়া যায়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণার সামনে হাজির করা হয়। অভিভাবকেরা ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে মেয়েদের শ্বশুরবাড়িতে না পাঠানোর অঙ্গীকার করেন।

জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার জানান, তালা ও সদর উপজেলার দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট ২৮টি বাল্যবিয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

অঙ্গীকারের পরও গোপনে বিয়ের অভিযোগ

শ্যামনগরের দাতিনাখালী গ্রামের একটি ঘটনাও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের পর নজরদারির সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। কোলবাড়ি নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ১৫ বছর বয়সী এক ছাত্রীর সঙ্গে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের সম্পর্ক ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। একপর্যায়ে তারা বাড়ি থেকে চলে যায়।

পরে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসা করে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে বিয়ে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং উভয় পক্ষের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, পরে কিশোরটির বাবা রফিকুল ইসলাম নোটারি এফিডেভিটের মাধ্যমে তাদের বিয়ে দেন। শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শফিউল ইসলাম পাটোয়ারী জানান, বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনগত প্রক্রিয়া নেওয়া হবে।

উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শরীফ বিন শফিক জানান, কিশোরটির বাবাকে নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি এখনো হাজির হননি।

উপকূলে দারিদ্র্য ও কুসংস্কারের চাপ

গাবুরা ইউনিয়নের চাঁদনীমুখা পরিজান আলিম মাদ্রাসার জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মো. আবদুর রহিম বলেন, উপকূলের অনেক পরিবার সুন্দরবন ও নদীনির্ভর জীবিকার ওপর নির্ভরশীল। দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও দুর্যোগের কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে না। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যেও গোপনে বিয়ের ঘটনা ঘটছে বলে তিনি জানান।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের পাশাপাশি মেয়েদের নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে পরিবারের উদ্বেগও বিয়ের সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করে। কোথাও কোথাও উপকূলের কঠিন পরিবেশে কাজ করলে মেয়েদের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়—এমন কুসংস্কারও বিয়ের চাপ বাড়ায় বলে স্থানীয়রা জানান।

গাবুরার ডুমুরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) হেলেনা বিলকিস বলেন, ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা গর্ভবতী নারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অল্প বয়সে বিয়ে ও গর্ভধারণের শিকার। তাদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা যায়। দুর্গম উপকূলীয় যোগাযোগব্যবস্থার কারণে জরুরি সময়ে উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

নজরদারির ঘাটতি

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধকর্মী সাকিবুর রহমান বাবলা বলেন, সাতক্ষীরায় পাঁচ শতাধিক মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত নজরদারি না থাকায় অনেক ঘটনা প্রশাসনের নজরের বাইরে থেকে যায়।

তিনি বলেন, কোনো বিয়ে ঠেকানোর পর পরিবারকে কিছুদিন নজরদারিতে রাখাও জরুরি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেই ধারাবাহিকতা থাকে না। গত এক মাসে তালা ও সদর উপজেলার দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২৮ ছাত্রীর বাল্যবিয়ের তথ্য পাওয়াই পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার বলেন, গোপনে বিয়ে এবং এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ের চেষ্টা থাকায় সব ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনের নজরে আসে না। এ কারণে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এফিডেভিট করলেই বিয়ে বৈধ নয়

সাতক্ষীরা আদালতের আইনজীবী বিপ্লব হোসেন বলেন, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী বিয়ের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের কম বয়সী নারী এবং ২১ বছরের কম বয়সী পুরুষকে অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য করা হয়। শুধু নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করলেই অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়ে বৈধ হয়ে যায় না। বয়স নির্ধারণে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সনদ যাচাই করা জরুরি।

তিনি বলেন, আইনের ১৯ ধারায় বিশেষ পরিস্থিতিতে অপ্রাপ্তবয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের নির্দেশ, বাবা-মা বা অভিভাবকের সম্মতি এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে বিয়ের বিশেষ বিধান রয়েছে। তবে এটি সাধারণভাবে অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়ের অনুমতি নয়; আইনে নির্ধারিত বিশেষ শর্ত পূরণ করতে হয়। সরকারি আইনভান্ডারেও ধারা ১৯-এর এই শর্তগুলো উল্লেখ রয়েছে।

একটি মেয়ের ফিরে আসার গল্প

তথ্যনুসন্ধানে সাতক্ষীরা শহরের ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর জীবনের ঘটনাও বাল্যবিয়ের মানবিক অভিঘাত সামনে এনেছে। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার মা কাজের জন্য ঢাকায় চলে যান। বাড়িতে একা হয়ে পড়ে মেয়েটি। পর্যাপ্ত পারিবারিক নজরদারির অভাবে স্থানীয় এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে সে। একপর্যায়ে অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয়।

বিয়ের পর সে জানতে পারে, তার স্বামী জুয়ায় আসক্ত ও ঋণগ্রস্ত। শুরু হয় পারিবারিক কলহ। একপর্যায়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসে মেয়েটি।

তবে সেখানেই থেমে থাকেনি তার জীবন। আবার পড়াশোনা শুরু করে সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষায় এ-মাইনাস পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে সে। এখন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছে। পাশাপাশি বৈবাহিক সম্পর্কের আইনগত অবসানের প্রস্তুতিও নিচ্ছে।

তার অভিজ্ঞতা দেখায়, বাল্যবিয়ে শুধু একটি মেয়ের শিক্ষাজীবন ব্যাহত করে না; এর পরিণতিতে তাকে অল্প বয়সেই বৈবাহিক দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সহিংসতা ও নানা সামাজিক-মানসিক সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

শুধু বিয়ে ঠেকালেই হবে না

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শুধু বিয়ের আয়োজন বন্ধ করলেই হবে না। ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত একজন কিশোরী যাতে নিরাপদে থাকে, বিদ্যালয়ে নিয়মিত যায় এবং ঝরে না পড়ে—সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

এর পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা, বিদ্যালয়ভিত্তিক নিয়মিত নজরদারি, বিয়ে ঠেকানোর পর পরিবারগুলোর ওপর ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ এবং বয়স যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। আইন অনুযায়ী বাল্যবিবাহে শুধু প্রাপ্তবয়স্ক বর-কনে নয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

সাতক্ষীরার উপকূলীয় বাস্তবতায় তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধকে শুধু প্রশাসনিক অভিযান হিসেবে না দেখে শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহায়তা ও স্থানীয় পর্যায়ের দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তাই সামনে আসছে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর