মাত্র চার হাজার টাকা মাসিক বেতনে চাকরি করা এক ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে গড়ে তোলেন বিশাল শিল্পসাম্রাজ্য—এমন প্রশ্ন সামনে এসেছিল ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। তিতাস গ্যাসের সাবেক কর্মচারী আবদুল কাদির মোল্লা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে দুই হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের তথ্য উঠে এসেছিল দুর্নীতি ও গুরুতর অপরাধ অনুসন্ধানে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্সের অনুসন্ধানে। ২০০৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে আসে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ঢাকার ফ্ল্যাট, গাড়ি, জমি ও অন্যান্য সম্পদের বিস্তৃত বিবরণ।
কিন্তু দুই দশকের কাছাকাছি সময় পেরিয়ে সেই অনুসন্ধানের পরিণতি কী? সম্পদের উৎস সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল? কোনো মামলা হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে তার অগ্রগতি কী? রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর থাকা জরুরি। কারণ, বিপুল সম্পদের তথ্য প্রকাশিত হওয়া আর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়; একইভাবে, অনুসন্ধানের ফলাফল জনসমক্ষে না আসাও জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
চার হাজার টাকার চাকরি থেকে হাজার কোটি টাকার সম্পদ
২০০৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারির সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবদুল কাদির মোল্লা একসময় তিতাস গ্যাস কোম্পানিতে বিক্রয় সহকারী হিসেবে চাকরি করতেন। পরে তিনি স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেন। চাকরির শেষ দিকে তাঁর মাসিক বেতন ছিল চার হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসায় বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
তৎকালীন টাস্কফোর্সের অনুসন্ধানে তাঁর পরিবারের সদস্যদের মালিকানা বা অংশীদারত্বে একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ঢাকায় ফ্ল্যাট, গাড়ি, জমি এবং আর্থিক সম্পদের তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে এসব সম্পদের মোট মূল্য দুই হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এখানে মৌলিক প্রশ্নটি হলো—এই বিপুল সম্পদের কতটুকু বৈধ ব্যবসায়িক আয়, কতটুকু বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্জিত এবং কোনো অংশের সঙ্গে অবৈধ অর্থ, কর ফাঁকি কিংবা আর্থিক অনিয়মের সম্পর্ক ছিল কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, আয়কর নথি, কোম্পানির নিরীক্ষিত হিসাব, ব্যাংক লেনদেন এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল দিয়ে নির্ধারণ করতে হবে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ১৩টি ফ্ল্যাট, ২৯টি গাড়ি ও ৪৫ একর জমি
প্রকাশিত প্রতিবেদনে আবদুল কাদির মোল্লা ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। এর মধ্যে থার্মেক্স টেক্সটাইল, থার্মেক্স কটন স্পিনিং, থার্মেক্স মিলাঞ্জ স্পিনিং মিলস, থার্মেক্স হোম ফেব্রিক্স, থার্মেক্স নিট ইয়ার্ন, থার্মেক্স ডেনিম, থার্মেক্স ব্লেন্ডেড ইয়ার্ন, আদুরী অ্যাপারেলস, আদুরী নিট কমপোজিট এবং আদুরী ওয়াশিং অ্যান্ড প্রিন্টিংসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল।
এ ছাড়া গ্যাস ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কথাও প্রতিবেদনে উঠে আসে।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের তালিকায় ঢাকায় ১৩টি ফ্ল্যাট, ২৯টি গাড়ি এবং ৪৫ একর জমির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছিল। পাশাপাশি বাড়ি, খামারবাড়ি এবং ব্যাংক বা অন্যান্য হিসাবে গচ্ছিত অর্থের বিবরণও উঠে আসে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, আবদুল কাদির মোল্লার নিজের দেওয়া হিসাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাদে অন্যান্য সম্পদের মূল্য ছিল প্রায় ২০৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে, টাস্কফোর্সের অনুসন্ধানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগসহ মোট সম্পদের পরিমাণ দুই হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নিয়ে ওই প্রতিবেদনে অসংগতি রয়েছে। শিরোনাম ও প্রাথমিক বিবরণে ১৬টি প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হলেও, প্রশ্নের জবাবে আবদুল কাদির মোল্লা নিজে পাঁচটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক বলে উল্লেখ করেছিলেন। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত মালিকানা, পরিবারের সদস্যদের অংশীদারত্ব এবং সম্পদের তৎকালীন মূল্যায়ন মূল নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাবও চেয়েছিল টাস্কফোর্স
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ২৫ অক্টোবর আবদুল কাদির মোল্লার সম্পদের হিসাব চেয়ে চিঠি পাঠায় টাস্কফোর্স। পরে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাবও চাওয়া হয়। ওই বছরের ৪ নভেম্বর তিনি সম্পদের হিসাব জমা দেন। এতে স্ত্রী, সন্তান, জামাতা, ভাই এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সম্পদের বিবরণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এত বড় পরিসরে সম্পদের হিসাব সংগ্রহের পর অনুসন্ধান কোন পর্যায়ে গিয়েছিল, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। সম্পদের উৎস সম্পর্কে কোনো অসংগতি শনাক্ত হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তী তদন্ত করেছিল কি না, কোনো মামলা বা আদালতকেন্দ্রিক কার্যক্রম হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ঘটনাটির পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
প্রকাশিত সম্পদের হিসাবই অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। কিন্তু এমন অনুসন্ধানের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সেটি জানার অধিকার জনগণের রয়েছে।
আওয়ামী লীগ আমলে ব্যবসায়িক বিস্তার, ব্যাংকঋণ নিয়ে প্রশ্ন
ওয়ান-ইলেভেনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে আবদুল কাদির মোল্লার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ব্যবসায়িক কার্যক্রম, ব্যাংকঋণ এবং আর্থিক লেনদেন নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলোরও নথিভিত্তিক পর্যালোচনা প্রয়োজন।
ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়ার মতো অভিযোগ গুরুতর।
সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার এন্ড কমার্স ব্যাংক পিএলসির সর্বল্ক্ষনা শাখা থেকে উক্ত শাখার মনিরুজ্জামান নামে এক গ্রাহকের নামে প্রায় শত কোটি টাকা উত্তোলন করে নেন। তখন এ জেড এম শফিউদ্দিন শামীম
সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার এন্ড কমার্স ব্যাংক লিমিটেড-এর চেয়ারম্যান ছিলেন। তার হাতে ধরা পড়ে এই জালিয়াতি। এমন আরো একাধিক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল, জবাবদিহির প্রশ্ন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আবদুল কাদির মোল্লার ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে বিএনপি ও জামায়াতের কিছু নেতার সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়।
পুরোনো টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি, কোম্পানির আর্থিক বিবরণী এবং আদালতের রেকর্ড পর্যালোচনা করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
সম্পদের উৎস যাচাই ও আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত হোক
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ও শিল্প বিনিয়োগের পরিবেশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে বড় ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি—কারও জন্যই আলাদা মানদণ্ড থাকতে পারে না। বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দায়মুক্তির সুযোগও দিতে হবে।
আবদুল কাদির মোল্লা ও তাঁর পরিবারের সম্পদ নিয়ে ২০০৮ সালে প্রকাশিত তথ্যের পর কী ঘটেছিল, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তদন্ত হয়েছিল কি না, হলে তার ফলাফল কী, কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল কি না—এসব তথ্য গোপন বা অনির্দিষ্ট থাকলে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
দুর্নীতির অভিযোগের বিচার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী ঘোষণা না করাও ন্যায়বিচারের শর্ত।