বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামকে প্রত্যাহার ও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্টরা। মানববন্ধনে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম, ভুয়া বিল উত্তোলন, টেন্ডারসংক্রান্ত অনিয়ম ও ঠিকাদারদের হয়রানিসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন বক্তারা।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা দাবি করেন, মো. শহিদুল ইসলাম পটুয়াখালীতে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। পরে বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাঁর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের আগস্টের পর বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে পরিবর্তন এলেও শহিদুল ইসলাম বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে বহাল রয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশিত হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তারা।
২৪ ঠিকাদারের লিখিত অভিযোগ
এর আগে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, ভুয়া বিল উত্তোলন, টেন্ডারসংক্রান্ত অনিয়ম ও ঠিকাদারদের হয়রানির অভিযোগ তুলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ২৪ জন ঠিকাদার।
লিখিত অভিযোগে ঠিকাদাররা দাবি করেন, নির্বাহী প্রকৌশলীর চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে কমিশন না দিলে কাজ শতভাগ শেষ হওয়ার পরও বিল পরিশোধে জটিলতা তৈরি করা হয়। এমনকি মাঠপর্যায়ে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও কাগজে-কলমে অগ্রগতি দেখিয়ে বিল প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেন তারা।
কাজের জামানতের টাকা ফেরত পেতেও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কথা বললে বিল আটকে দেওয়া বা কাজের সাইটে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরির আশঙ্কায় অনেক ঠিকাদার প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে চান না বলেও দাবি করা হয়।
লিখিত অভিযোগে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। গত বছরের ২৯ নভেম্বর ফারুক হোসেন নামে এক ঠিকাদারকে ফোনে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পরদিন ৩০ নভেম্বর বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় জিডি (নম্বর-২০৭৬) করেন ওই ঠিকাদার।
এ ছাড়া দপ্তরের সরকারি রেস্ট হাউস ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কর্মদিবসে প্রকৌশলীদের অনুপস্থিতির অভিযোগ
এদিকে কর্মদিবসে বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ১৪ প্রকৌশলীর কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে সিলেট ভ্রমণে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে দপ্তরের হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৯ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম, সহকারী প্রকৌশলী আবির হাসান, উপসহকারী প্রকৌশলী আশিকুর রহমান ও সাদিয়া সুলতানা জেবা দপ্তর থেকে বের হয়ে যান। পরদিনও তাঁরা কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন না বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া সহকারী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এবং সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) আফজাল হোসেন ৭ সেপ্টেম্বর থেকে অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন বলে হাজিরা খাতায় উল্লেখ রয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
একাধিক সূত্রের দাবি, ৯ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে দপ্তরের কয়েকজন প্রকৌশলী ও বিভিন্ন উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলীরা বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। পরে তাঁরা ঢাকা থেকে বিমানে সিলেট যান। সেখান থেকে তাঁদের হবিগঞ্জের বাহুবলে যাওয়ার কথা জানা যায়।
সূত্রগুলোর আরও দাবি, প্রকৌশলীদের একটি দল বাহুবল উপজেলার পুটিজুরী এলাকার একটি রিসোর্টে কয়েকদিন অবস্থান করেন। তবে এ সফরের ব্যয় কে বহন করেছেন, সরকারি অনুমোদন ছিল কি না এবং সফরের আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্য কী—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, একজন ঠিকাদারের অর্থায়নে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ কয়েকজন প্রকৌশলী ওই সফরে যান। তবে এ দাবিরও স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে অভিযোগগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেরও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
মানববন্ধনে বক্তারা সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, প্রকল্পের কাজের মান নিশ্চিত করা এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।