আমন ধান ঘরে তোলার পরই নতুন ফসলের স্বপ্নে মাঠে নেমেছেন নীলফামারীর সৈয়দপুরের কৃষকরা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমিতে চলছে চাষাবাদ, বীজ রোপণ, সেচ, সার প্রয়োগ ও পরিচর্যার কাজ। আগাম আলু ও শীতকালীন সবজি ঘিরে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠ এখন কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের ব্যস্ততায় মুখর।
সৈয়দপুরের কামারপুকুর, কাশিরাম বেলপুকুর, খাতামধুপুর, বোতলাগাড়ি ও বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নে ইতোমধ্যে আগাম আলুর পাশাপাশি শীতকালীন নানা সবজির আবাদ শুরু হয়েছে। এক কৃষকের সাফল্য দেখে অন্যরাও আগাম আলু ও সবজি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষকদের কাছে এই আগাম আলু শুধু একটি লাভজনক ফসল নয়; ৫০ থেকে ৭০ দিনের মধ্যেই ঘরে তোলা যায় বলে অনেকের সংসারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যয়ের জোগানও আসে এ ফসল থেকে। কারও মেয়ের বিয়ে, কারও ঋণ পরিশোধ, আবার কারও সংসারের প্রয়োজন মেটানোর আশাও জড়িয়ে আছে আগাম আলুর ফলনের সঙ্গে।
কাশিরাম ইউনিয়নের কৃষক আজমত আলী জানান, স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ‘সেভেন’ জাতের আলু রোপণের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা যায়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার আগাম আলুর ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন তিনি। বাজারদর ভালো থাকার প্রত্যাশায় এবারও আগাম জাতের আলু চাষ করেছেন বলে জানান এই কৃষক।
আগাম আলু ও শীতকালীন সবজির আবাদ বাড়ায় এলাকায় কৃষিশ্রমিকের চাহিদাও বেড়েছে। বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের কৃষক রহিম উদ্দিন জানান, শ্রমিক সংকটের কারণে বর্তমানে নারী শ্রমিককে দৈনিক প্রায় ৩৫০ টাকা এবং পুরুষ শ্রমিককে ৭০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হচ্ছে।
সৈয়দপুর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে বোতলাগাড়িতে শাক-সবজির আবাদ সবচেয়ে বেশি। এখানকার উৎপাদিত সবজি স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। এ কারণে এলাকাটি শাক-সবজি উৎপাদনের জন্য আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। কৃষকদের অনেকেই জানান, সারা বছর বিভিন্ন ধরনের ফসল আবাদ করায় একসময় কর্মহীন থাকা অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পাশাপাশি সবজি বিক্রির আয় দিয়ে বদলেছে অনেক পরিবারের জীবনযাত্রার মান।
বর্তমানে বিভিন্ন সবজির খেতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ও শ্রমিকরা। কোথাও ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, মুলা, লাউ, করলা, কাঁচা মরিচ ও বরবটির পরিচর্যা চলছে; আবার কোথাও পালং, নাপা ও লাল শাকের জমিতে চলছে সেচ, কীটনাশক প্রয়োগ ও আগাছা পরিষ্কারের কাজ। উৎপাদিত সবজি সৈয়দপুরের বাজারে পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক পাইকার সরাসরি কৃষকের খেত থেকে সবজি কিনে ট্রাকে করে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাচ্ছেন।
সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীমান ভূষণ জানান, আমন ধান কাটার পরপরই উঁচু জমিগুলোতে কৃষকেরা আলু ও সবজি চাষে নেমেছেন। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগাম আলু ও সবজিতে কৃষকেরা ভালো বাজারদর পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমায়রা মণ্ডল বলেন, বিভিন্ন ইউনিয়নে আগাম আমন ধান কাটার পরপরই কৃষকেরা জমি প্রস্তুত করে আলু রোপণ শুরু করেছেন। কেউ ইতোমধ্যে আলু রোপণ শেষ করেছেন, আবার কেউ জমি প্রস্তুতের কাজে ব্যস্ত। ফলে মাঠে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিকের চাহিদা ও মজুরি। তিনি বলেন, আগাম আলু চাষে নীলফামারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি সৈয়দপুরে আগাম শাক-সবজির আবাদও জেলার কৃষি অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।