শিরোনাম

নদীর জাল থেকে ব্যবসায়, ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন বাঘবিধবারা সুন্দরবন উপকূলের নারীদের সংগ্রামী জীবনে নতুন আশার আলো

নদীর জাল থেকে ব্যবসায়, ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন বাঘবিধবারা সুন্দরবন উপকূলের নারীদের সংগ্রামী জীবনে নতুন আশার আলো

স্বামী হারানোর পর সংসারের হাল ধরতে সুন্দরবন উপকূলীয় নদীতে জাল টেনে মাছ ধরতেন পারভীন আক্তার। কখনো জালে মাছ উঠত, কখনো খালি হাতেই ফিরতে হতো। অনিশ্চিত সেই আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলত সংসার। একই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন খাদিজা খাতুনও। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে তাদের জীবন। একজন এখন চাল ও পোলট্রি ফিডের ব্যবসা করছেন, অন্যজন পেয়েছেন টেইলারিংয়ের দোকান। দুজনই এখন নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।

সুন্দরবন উপকূলীয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বাঘবিধবাদের জীবন এমনই সংগ্রামের। স্বামী হারানোর শোকের পাশাপাশি দারিদ্র্য, সন্তানের ভবিষ্যৎ, সামাজিক চাপ ও জীবিকার অনিশ্চয়তার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয় তাদের।

সুন্দরবনে জীবিকার সন্ধানে গিয়ে বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো এসব নারীর মানসিক শক্তি বাড়ানো এবং স্বাবলম্বী হওয়ার পথ তৈরি করতে ৪০ জন বাঘবিধবাকে নিয়ে আয়োজন করা হয় মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা বিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান।

পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সুন্দরবনসংলগ্ন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের সিএমসি কার্যালয়ে ‘মন সুস্থ থাক, জীবন এগিয়ে যাক ৩.০’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জেসিআই ঢাকা সাউথের উদ্যোগে এবং ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (আইসিডি)-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত সেশনে শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের নারীরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া নারীরা তাদের জীবনের নানা সংকট, স্বামী হারানোর পরের কঠিন সময় এবং ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। আলোচনায় উঠে আসে মানসিক সুস্থতা, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং টেকসই কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা।

খাদিজা খাতুন বলেন, স্বামী হারানোর পর দীর্ঘদিন অনেক কষ্টে সংসার চালিয়েছেন তিনি। পরে জেসিআইয়ের সহযোগিতায় একটি টেইলারিংয়ের দোকান পেয়েছেন। এখন সেই দোকান থেকে আয় করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, “স্বামীকে হারানোর পর অনেক কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে। এখন আমাদের কথা শোনা হচ্ছে, মানসিকভাবে সাহস দেওয়া হচ্ছে এবং কাজের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে নতুন করে বাঁচার সাহস পাচ্ছি।”

পারভীন আক্তারের সংগ্রামের গল্পও ভিন্ন নয়। সংসারের খরচ জোগাতে দীর্ঘদিন নদীতে জাল টেনে মাছ ধরেছেন তিনি। নদীতে মাছ না পেলে সেদিন আয়ও হতো না। সেই অনিশ্চয়তা কাটিয়ে এখন ব্যবসার মাধ্যমে নতুনভাবে জীবন গড়ার চেষ্টা করছেন।

পারভীন বলেন, “আগে নদীতে জাল টেনে মাছ ধরে কষ্ট করে সংসার চালাতাম। জেসিআই থেকে চাল ও পোলট্রি ফিড দেওয়ায় এখন স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছি।”

আয়োজকেরা বলেন, বাঘবিধবাদের পুনর্বাসনে শুধু আর্থিক সহায়তা যথেষ্ট নয়; তাদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। স্বামী হারানোর শোক, দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট, জীবিকার অনিশ্চয়তা ও সামাজিক চাপ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অর্থনৈতিক সহায়তার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং স্থায়ী আয়ের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

তারা আরও বলেন, বাঘবিধবাদের মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির পাশাপাশি টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সংগঠনটি কাজ করে যাচ্ছে। এসব নারী যেন স্বাবলম্বী হয়ে সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন, সেটিই তাদের মূল লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানে জেসিআই বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিরেক্টর কাজী মোতায়াজ্জেদ বিল্লাহ, জেসিআই ঢাকা সাউথের চেয়ারপারসন সাখাওয়াত হোসেন, প্রেসিডেন্ট লোকাল নাইম হায়দার, আইসিডির সভাপতি আশিকুজ্জামান, জেসিআই জিআইবি বিজনেসের তৌসিফ মুয়াসিন রাফিন, সিনেটর আতিকুর রহমান সম্রাট, নুর ইয়াশ শামস, উপকূলীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুল হালিমসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর