শিরোনাম
অভাবনীয় সাফল্য!

মাছের ঘেরের আইলে সবুজ বিপ্লব, সাতক্ষীরায় বাড়ছে বিষমুক্ত সবজি চাষ

মাছের ঘেরের আইলে সবুজ বিপ্লব, সাতক্ষীরায় বাড়ছে বিষমুক্ত সবজি চাষ

চিংড়ি চাষের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত সাতক্ষীরায় এবার মাছের ঘেরের আইলে সবজি চাষে দেখা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা। ঘেরের পাড় ও আইলে বাঁশের মাচা তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছেন কৃষকেরা। একই জমিতে মাছ ও সবজি উৎপাদনের এই সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা বাড়াচ্ছে কৃষকের আয়, পাশাপাশি তৈরি করছে পরিবেশবান্ধব কৃষির নতুন দৃষ্টান্ত।

কৃষকদের কাছে ‘সাথী ফসল’ হিসেবে শুরু হওয়া ঘেরের আইলে সবজি চাষ এখন অনেকের কাছে লাভজনক কৃষি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় প্রায় ৮৭৫ হেক্টর ঘেরের আইলে সবজি চাষ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ১৬ হাজার ৬২৫ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঘেরের পাড়জুড়ে সবুজের সমারোহ

সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের তালা অংশে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক দৃশ্য। সড়কের দুই পাশে যতদূর চোখ যায়, মাছের ঘেরের আইলে দেখা যায় সবুজের সমারোহ। কোথাও মাচাজুড়ে ঝুলছে লাউ, করলা ও কুমড়া। আবার কোথাও আইলে শোভা পাচ্ছে ঢেঁড়শ, পুঁইশাক, শসা, চিচিঙ্গা ও ধুন্দল।

কৃষি বিভাগ জানায়, ঘেরের চারপাশে বাঁশ ও জালের সাহায্যে ঝুলন্ত মাচা তৈরি করে লতানো সবজি চাষ করা হয়। এতে মাছ চাষের পাশাপাশি একই জমিতে সবজি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত জমি বা বড় বিনিয়োগ ছাড়াই কৃষকের আয় বাড়ছে।

সাত উপজেলায় ৮৭৫ হেক্টরে সবজি

উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঘেরের আইলে সবজি চাষ হয়েছে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায়। সেখানে প্রায় ৩৪০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে।

এ ছাড়া তালায় ১৬৫ হেক্টর, কালীগঞ্জে ১৩৫ হেক্টর, আশাশুনিতে ৮০ হেক্টর, শ্যামনগরে ৮০ হেক্টর, কলারোয়ায় ৫৫ হেক্টর এবং দেবহাটায় ২০ হেক্টর ঘেরের আইলে সবজি চাষ করা হয়েছে।

একই জমিতে মাছ-সবজি, বাড়ছে আয়

তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের গাবতলা গ্রামের ঘের মালিক ইসরাইল হোসেন ১৬ একর জমির ঘেরের তিন পাশে সবজি চাষ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, এতে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আবহাওয়া ও বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার সবজি বিক্রির আশা করছেন তিনি।

একই এলাকার ঘের ব্যবসায়ী মোহর আলী এক একর ঘেরের চারপাশে ডাবল মাচা পদ্ধতিতে সবজি চাষ করেছেন। তাঁর আশা, এ পদ্ধতিতে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকার বেশি মুনাফা পাওয়া সম্ভব হবে।

উৎপাদন খরচ কৃষকের, লাভের বড় অংশ মধ্যস্বত্বভোগীর?

তবে উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে অভিযোগ রয়েছে কৃষকদের। তালার মিঠাবাড়ী এলাকার কৃষক সুমন জানান, বর্তমানে তারা মাঠ পর্যায়ে প্রতি কেজি করলা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি করছেন। অথচ পাইকারি বাজারে একই করলার দাম ৪০ থেকে ৪৫ টাকা এবং খুচরা বাজারে তা ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত উঠছে।

তিনি বলেন, ‘সবজি উৎপাদনে আমাদের শ্রম, মাচা তৈরি, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহনসহ সব খরচ বহন করতে হয়। কিন্তু উৎপাদনস্থল থেকে বাজার পর্যন্ত দামের ব্যবধান অনেক বেশি।’

কৃষকদের অভিযোগ, সরাসরি বড় পাইকার বা মোকামের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ সীমিত হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছেই অনেক সময় কম দামে সবজি বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা। ফলে উৎপাদনের মূল ঝুঁকি বহন করেও ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকেরা।

বিষমুক্ত সবজিতে বাড়ছে আগ্রহ

কৃষকদের মতে, দেশে ও বিদেশে নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবজির চাহিদা বাড়ায় ঘেরের আইলে সবজি চাষের প্রবণতাও বেড়েছে। মাছের সঙ্গে সবজি উৎপাদনের সমন্বিত এই পদ্ধতি একদিকে কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করছে।

সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘জেলার অধিকাংশ ঘেরের পাড়ে এখন সবজি চাষ হচ্ছে। আগাম মৌসুমের লাউ, উচ্ছে, শসা ও বরবটি বাজারে আসতে শুরু করেছে। কৃষকেরা ভালো দাম পাচ্ছেন। উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি বিভাগ মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছে।’

পদ্মা সেতুতে বেড়েছে বাজারের পরিধি

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ বলেন, গত কয়েক বছরে ঘেরের আইলে সবজি চাষে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। পদ্মা সেতুর কারণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত সবজি পরিবহন সম্ভব হচ্ছে। এতে কৃষকেরা ভালো দাম পাচ্ছেন এবং পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কমেছে।

তিনি বলেন, ‘সাতক্ষীরা চিংড়ির রাজধানী হিসেবে পরিচিত হলেও সবজি উৎপাদনেও জেলার সুনাম রয়েছে। জেলার মোট সবজি উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে মাছের ঘেরের আইল থেকে।’

কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার মনিটরিং জোরদারের কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, কোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দেশের জন্য হতে পারে অনুসরণীয় মডেল

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাছ ও সবজি চাষের সমন্বিত এই পদ্ধতি শুধু কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে না; একই সঙ্গে সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার সুযোগ তৈরি করছে।

সাতক্ষীরার ঘেরের আইলে গড়ে ওঠা এই সবুজ বিপ্লব তাই এখন শুধু স্থানীয় কৃষকের সাফল্যের গল্প নয়—সঠিক বাজারব্যবস্থা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশের অন্যান্য মাছচাষপ্রধান অঞ্চলের জন্যও অনুসরণীয় একটি কৃষি মডেল হয়ে উঠতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর