ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা টিকটকের মতো বৈশ্বিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আধিপত্যের মধ্যেই নিজেদের প্রযুক্তি, কনটেন্ট ও কণ্ঠ নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখছে রংপুর। ফেসবুকের বিকল্প হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে দেশীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ফ্রিডার’।
উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, এটি শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়; বরং বাংলাদেশিদের জন্য নিজেদের গল্প, সংবাদ, মতামত ও সৃজনশীলতা তুলে ধরার একটি নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ‘নিজেদের কণ্ঠ, নিজেদের প্ল্যাটফর্ম’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে তৈরি করা হয়েছে ফ্রিডার।
প্ল্যাটফর্মটিতে বন্ধু সংযোগ, সংবাদ, ভয়েস চ্যানেলসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে। ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলেও দাবি উদ্যোক্তাদের।
স্থানীয় কনটেন্টে গুরুত্ব
ফ্রিডারের অন্যতম বিশেষত্ব হিসেবে স্থানীয় কনটেন্টকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। তাদের প্রত্যাশা, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তৈরি হওয়া খবর, গল্প, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কনটেন্ট এখানে সহজেই জায়গা পাবে।
ফলে শুধু ঢাকা বা বড় শহর নয়, জেলা-উপজেলা এমনকি গ্রামের মানুষের গল্পও বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন তারা।
এক হাজার ফলোয়ারেই মনিটাইজেশন
তরুণ প্রজন্ম ও কনটেন্ট নির্মাতাদের আকৃষ্ট করতে ফ্রিডারে রাখা হয়েছে আয়ের সুযোগ। উদ্যোক্তাদের দাবি, মাত্র এক হাজার ফলোয়ার হলেই কনটেন্ট নির্মাতারা মনিটাইজেশনের সুবিধা পাবেন।
তাদের মতে, এতে নতুন নির্মাতাদের দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে না। তুলনামূলক কমসংখ্যক দর্শক নিয়েই আয়ের পথ তৈরি করা সম্ভব হবে।
উদ্যোক্তারা আশা করছেন, এর মাধ্যমে বেকার তরুণদের একটি অংশ ঘরে বসেই কনটেন্ট তৈরি করে আয় করতে পারবেন। পাশাপাশি প্রযুক্তি, কনটেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং ও অনলাইন সেবাকে ঘিরে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
‘অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা’
দেশীয় প্রযুক্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরির উদ্যোগ বাংলাদেশে অবশ্য নতুন নয়। অতীতেও সরকারি উদ্যোগে কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চালুর চেষ্টা হয়েছিল। তবে সেসব উদ্যোগ প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা।
ফ্রিডারের প্রতিষ্ঠাতা আখতারুজ্জামান বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই ব্যবহারকারীর চাহিদা, নিরাপত্তা, কনটেন্ট ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, যাত্রার শুরুতেই দেশ-বিদেশের প্রায় ১০ হাজার ব্যবহারকারীর আগ্রহ পাওয়া গেছে।
আখতারুজ্জামানের মতে, ফ্রিডার শুধু রংপুরের উদ্যোগ নয়, এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্যও সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলতে পারে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
তবে ফেসবুকের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সহজ নয়। প্রতিষ্ঠিত এসব প্ল্যাটফর্মের রয়েছে বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তি, উন্নত প্রযুক্তি, বিপুল বিনিয়োগ ও দীর্ঘদিনের অর্জিত আস্থা।
এই বাস্তবতায় ফ্রিডারকে টিকে থাকতে হলে ব্যবহারকারীর আস্থা অর্জন, নিয়মিত প্রযুক্তি উন্নয়ন, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, মানসম্মত কনটেন্ট এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
আখতারুজ্জামান বলেন, “বড় এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যক্তি উদ্যোগে পেরে ওঠা যাবে না। এ জন্য সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ ও আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন।”
তিনি বলেন, শুধু ফেসবুকের বিকল্প হওয়ার স্বপ্নে তারা থেমে নেই। বাংলাদেশের মেধা ও প্রযুক্তিকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য। বিদেশি প্ল্যাটফর্মের পরিবর্তে দেশীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি অংশ দেশের ভেতরে রাখার চেষ্টাও রয়েছে।
নিরাপত্তাকে গুরুত্ব
ফ্রিডারের হেড অব সাপোর্ট রেজাউল করিম বলেন, ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়েই প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছে। দ্রুতগতির ইন্টারনেট, ডেটা আদান-প্রদান এবং অশ্লীল ও হেয়প্রতিপন্নকারী পোস্ট থেকে ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
কম খরচে বিভিন্ন সুবিধা
ফ্রিডারের মার্কেটিং প্রধান বাদশা আলম বলেন, প্ল্যাটফর্মটির কার্যক্রম মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে যারা একবার ফ্রিডারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, তাদের ধারণা বদলে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি জানান, ১৫০ টাকায় প্রোফাইল তৈরি, ৩০০ টাকায় পেজ ভেরিফিকেশন, কম খরচে পোস্ট প্রমোট ও বিজ্ঞাপন এবং এক হাজার ফলোয়ারে পেজ মনিটাইজেশনের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি মনিটাইজেশন ছাড়াও ‘ফ্রিডার অ্যাম্বাসেডর প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে আয়ের সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
রংপুরে ১৬ জনের কর্মসংস্থান
রংপুর নগরীর ধাপ এলাকায় ফ্রিডারের একটি কার্যালয়ে বিভিন্ন পদে বর্তমানে ১৬ জন কর্মরত রয়েছেন।
কনটেন্ট মডারেটর ইশরাত জাহান ইশা বলেন, চলতি বছরের ১৫ মে প্ল্যাটফর্মটির যাত্রার শুরুতে তার মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করত। এখন প্রতিদিন পেজের ফলোয়ার ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে কাজের চাপ যেমন বেড়েছে, তেমনি তার আয়ের পথও সুগম হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বপ্ন কতটা বাস্তব হবে, বলবে সময়
রংপুরের মাটি থেকে যাত্রা শুরু করা ‘ফ্রিডার’ এখন শুধু একটি অ্যাপ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়; উদ্যোক্তাদের কাছে এটি দেশীয় প্রযুক্তি দিয়ে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতার একটি উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ।
তবে বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে এগিয়ে থাকা বৈশ্বিক জায়ান্টদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ফ্রিডার কতটা জায়গা করে নিতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তারপরও ‘নিজেদের কণ্ঠ, নিজেদের প্ল্যাটফর্ম’—এই ধারণাকে সামনে রেখে রংপুর থেকে শুরু হওয়া উদ্যোগটি বাংলাদেশের তরুণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এর ভবিষ্যৎ সাফল্য নির্ভর করবে ব্যবহারকারীর আস্থা, প্রযুক্তির মান, নিরাপত্তা ও ধারাবাহিক উন্নয়নের ওপর।