শিরোনাম
৯ মাসে আক্রান্ত ১,৪৮৭, মৃত্যু ৪; জুলাই থেকে আড়াই মাসেই আক্রান্ত ১,৪৪৩

বাড়ছে ডেঙ্গুর থাবা, উত্তরের আট জেলায় বাড়ছে উদ্বেগ

বাড়ছে ডেঙ্গুর থাবা, উত্তরের আট জেলায় বাড়ছে উদ্বেগ

রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে পরিচিত ডেঙ্গু এবার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে উত্তরের জনপদেও। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রংপুর বিভাগের আট জেলায় যেখানে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৪ জন, সেখানে জুলাই থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আড়াই মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন আরও ১ হাজার ৪৪৩ জন। একই সময়ে মারা গেছেন চারজন। হঠাৎ করে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিভাগের আট জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত বিভাগের আট জেলার সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪৮৭ জন। এর মধ্যে রংপুরে ৪১৭, নীলফামারীতে ২১০, দিনাজপুরে ২০৩, কুড়িগ্রামে ১৭২, গাইবান্ধায় ১৪৯, ঠাকুরগাঁওয়ে ১২৩, লালমনিরহাটে ১০৮ এবং পঞ্চগড়ে ১০৫ জন।

এ সময় চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৩৪৮ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৩৫ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ডেঙ্গুতে এ সময়ে কুড়িগ্রাম জেলা হাসপাতালে দুজন, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজনসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছর রংপুর বিভাগের সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোনো ঘটনা না থাকলেও চলতি বছর পরিস্থিতি বদলে গেছে।

৭২ ঘণ্টায় রংপুর মেডিকেলে ৬৯ রোগী

সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ১২ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টায় শুধু রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৬৯ জন।

এ ছাড়া ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের আট জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে নতুন করে ৬৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ১৩ সেপ্টেম্বর পীরগঞ্জ উপজেলার মিনারা বেগম (৪০) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হাসপাতাল ও পারিবারিক সূত্রের ভাষ্য, তিনি ঢাকা থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রংপুরে ফেরেন। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

এদিকে রংপুরের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মিঠাপুকুর উপজেলার জান্নাতি খাতুন নামে আরও এক নারী মারা গেছেন। তিনি প্রথমে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়।

শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও সংক্রমণের ঝুঁকি

একসময় ডেঙ্গুকে মূলত রাজধানী ও বড় শহরের রোগ হিসেবে দেখা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর বিস্তার দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে নতুন এলাকায় ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। রাজধানী বা অন্য কোনো শহর থেকে আক্রান্ত ব্যক্তি গ্রামে ফিরলে স্থানীয় এডিস মশা তাকে কামড়ানোর পর সেই মশার মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে।

অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং বৃষ্টির পানি জমে থাকা, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার, ডাবের খোসা ও ফুলের টবসহ বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় গ্রামাঞ্চলেও এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর কোনো কোনো রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে। তাই জ্বর বা ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কাউনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসান হাবীব বলেন, সামান্য জ্বর বা ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বাড়ির আশপাশে ডাবের খোসা, টায়ার, ফুলের টব কিংবা পরিত্যক্ত কোনো পাত্রে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। মশক নিধনেও প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি জানান, এখন পর্যন্ত কাউনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু আক্রান্ত কোনো রোগী ভর্তি হননি। তবে রোগ নির্ণয়ের কিটসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রস্তুতি রয়েছে।

আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার দ্রুত বাড়ছে আক্রান্ত

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিভাগের আট জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২৬৫ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪৯৪ জন; মারা যান ১২ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে ১ হাজার ৪৭২ জন হলেও মারা যান দুজন। ২০২৫ সালে আক্রান্ত হন ১ হাজার ১৮৭ জন; ওই বছর কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেও পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বিভাগের আট জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হন মাত্র ৪৪ জন। এর মধ্যে রংপুরে ১১, গাইবান্ধায় ১০, লালমনিরহাট ও নীলফামারীতে আটজন করে, দিনাজপুরে চারজন এবং ঠাকুরগাঁওয়ে তিনজন আক্রান্ত হন। ওই সময়ে ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

কিন্তু জুলাই থেকে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৮৭ জনে। অর্থাৎ বছরের প্রথম ছয় মাসের ৪৪ জনের বিপরীতে পরবর্তী আড়াই মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৪৩ জন।

রোগীর চাপ সামলাতে বাড়তি প্রস্তুতি

ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে বাড়তি প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ কর্নার চালু করা হয়েছে এবং ৩৮টি শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ৩১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, বিভিন্ন পরিত্যক্ত জায়গা, বাড়ির ছাদসহ যেসব স্থানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেসব স্থান শনাক্ত করে ধ্বংসে নিয়মিত অভিযান চলছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, চলতি বছর রংপুর বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মশক নিধন, মশারি ব্যবহারসহ সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। শুধু অভিযান নয়, জনসম্পৃক্ততাও জরুরি।

রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন জানান, আগামী তিন মাস ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে নিয়মিত লার্ভিসাইড স্প্রে করা হচ্ছে। পাশাপাশি নির্ধারিত রুটিন অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ডে ফগিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকদের নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় চিকিৎসার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান উপায়। বাড়ি, প্রতিষ্ঠান ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করা গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। উত্তরের আট জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় এখন প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপরই জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর