শিরোনাম

রাস্তা বন্ধে অবরুদ্ধ এক পাড়ার ৩০ পরিবার

রাস্তা বন্ধে অবরুদ্ধ এক পাড়ার ৩০ পরিবার

৯৬ বছর বয়সী ভজন চন্দ্র দে। প্রায় ছয় দশক ধরে বাড়ি থেকে বের হতে গ্রামের একটি সরু পথ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তিন বছর ধরে সেই পথ বন্ধ। ফলে কোথাও যেতে হলে তাঁকে ঘুরে অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়। শুধু ভজন চন্দ্র দে নন, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দিঘি ইউনিয়নের স্বল্প হাতকোড়া গ্রামের প্রায় ৩০টি পরিবার একই দুর্ভোগের শিকার।

গ্রামবাসীর অভিযোগ, গ্রামের শ্রীরাম সাধু আশ্রমের দক্ষিণ পাশ দিয়ে পশ্চিম দিকে যাওয়া প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ একটি রাস্তা স্থানীয় ছিদাম সরকার ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে আশ্রমের পেছনে বসবাসকারী পরিবারগুলো চলাচলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিস-মীমাংসা হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।

মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, আশ্রমের সীমানাপ্রাচীরের দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে পশ্চিম দিকে যাওয়া রাস্তার একটি অংশ মাটি ভরাট করে উঁচু করা হয়েছে। সেখানে একটি ছাপড়া ঘরও নির্মাণ করা হয়েছে। এর পরেই রয়েছে কয়েকটি বসতবাড়ি। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ওই পথটিই তাঁদের চলাচলের সহজ ও প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

তিন বছরেও মেলেনি সমাধান

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রায় তিন বছর আগে দোল উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশীদের মধ্যে বিরোধের জেরে ছিদাম সরকার, তাঁর ছেলে সুদেব সরকার ও মেয়ে দুলমতি রাস্তা বন্ধ করে দেন।

এরপর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে অন্তত ৮ থেকে ১০ বার সালিস হয়েছে বলে জানান তাঁরা। এমনকি জমি পরিমাপ করে সীমানা নির্ধারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো উদ্যোগেই স্থায়ী সমাধান হয়নি।

শ্রীরাম সাধু আশ্রমে কথা হয় সজীব সেন, নেপাল সেন, প্রকাশ সরকার, আবুল কালাম আজাদ, অসীম, উজ্জ্বল, বাসুদেব চন্দ্র দে ও ভজন চন্দ্র দের সঙ্গে। তাঁরা জানান, আশ্রমের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের সময় রাস্তার জন্য জায়গা রেখে দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে ওই পথ দিয়ে আশপাশের মানুষ চলাচল করে আসছেন।

৯৬ বছর বয়সী ভজন চন্দ্র দে বলেন, “আমি ৬০ বছর ধরে এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করছি। তিন বছর ধরে রাস্তা বন্ধ। এখন বয়সের কারণে হাঁটতে কষ্ট হয়। তারপরও ঘুরে যেতে হয়। আমরা শুধু চলাচলের অধিকারটা ফিরে চাই।”

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ শিশু-বয়স্কদের

স্থানীয়দের দাবি, রাস্তা বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে শিশু ও বয়স্করা। স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের বিকল্প পথে যাতায়াত করতে হচ্ছে। কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো বাসিন্দার মৃত্যু হলে মরদেহ শ্মশানে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁদের সমস্যায় পড়তে হয়।

বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ বলেন, “একটি পরিবারের কারণে পুরো পাড়া কষ্ট করছে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিক।”

অভিযুক্ত পরিবারের বক্তব্য

তবে রাস্তা বন্ধের অভিযোগ অস্বীকার না করে জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি তুলে ধরেছে অভিযুক্ত পরিবার। মঙ্গলবার ছিদাম সরকারের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে, তাঁর ছেলে সুদেব সরকার ও মেয়ে দুলমতিকে পাওয়া যায়নি। তবে কথা হয় ছিদাম সরকারের স্ত্রী ছানি বালার সঙ্গে।

তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে দোল উৎসবের সময় তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মারধর করা হয়েছিল। তাঁদের গাছ কেটে ফেলা, মুরগি নিয়ে যাওয়া এবং বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ছানি বালা বলেন, “আমাদের জমি নিয়ে বিরোধ আছে। কাগজপত্র অনুযায়ী ২৪ শতাংশ জমি আমাদের। কিন্তু ঘেরে বেশি। জমি মাপার সময় অতিরিক্ত জমি ছেড়ে দিতে বলা হয়েছিল। আমরা আমাদের জমি ছাড়তে রাজি নই।”

অর্থাৎ, একদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি—দীর্ঘদিনের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে তাঁদের কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত পরিবারের দাবি—বিতর্কিত জায়গাটি তাঁদের মালিকানাধীন জমির অংশ এবং জমি নিয়ে বিরোধের কারণেই বিষয়টির সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা: ইউএনও

এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী নাসরিন বলেন, “এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তিন বছর ধরে চলা এ বিরোধের কারণে একটি পাড়ার মানুষ দুর্ভোগে রয়েছেন। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিস হলেও সমাধান না হওয়ায় এবার প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান তাঁরা।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ এবং আইনানুগভাবে চলাচলের সমস্যার সমাধানের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত সমস্যা সমাধানের অনুরোধ জানিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর