শিরোনাম

৭ জনের এক খাটে কষ্টের জীবন, তবুও শাবনাজের জিপিএ-৫

৭ জনের এক খাটে কষ্টের জীবন, তবুও শাবনাজের জিপিএ-৫

১০ বাই ১০ ফুটের জরাজীর্ণ একটি চালাঘর। ঘরের ভেতর একটিমাত্র খাট। সেই খাটেই বাবা-মাসহ পরিবারের সাত সদস্যের কোনো রকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই। কখনো খাবার জোটে, কখনো জোটে না। বাবার সারাদিনের পরিশ্রম আর মায়ের সীমাহীন কষ্টে কোনোরকমে চলে সংসার। এমন প্রতিকূলতাকেও হার মানিয়েছে অদম্য মেধাবী শাবনাজ খাতুন রানি।

নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের বাঁশবাড়ি মহল্লার বস্তি (ক্যাম্প) এলাকার এই ছোট্ট ঘরেই বেড়ে ওঠা শাবনাজ এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। সে সৈয়দপুর শহরের আল ফারুক একাডেমি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।

শাবনাজের কাছে এই সাফল্য শুধু একটি ফল নয়; এটি অভাব, অনিশ্চয়তা আর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তার দীর্ঘ লড়াইয়ের ফল।

নিজের জীবনসংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে শাবনাজ জানায়, ভালো ফলাফলের জন্য সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব তার বাবা-মায়ের। এরপর শিক্ষকদের সহযোগিতার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে সে।

শাবনাজ বলে, অনেক রাত না খেয়েও কাটাতে হয়েছে। তার বাবা মো. ইসমাইল সৈয়দপুর শহরে রিকশা চালান। প্রতিদিন ভোর ৫টার দিকে রিকশা নিয়ে বের হন তিনি। ফিরতে ফিরতে গভীর রাত। সঙ্গে থাকে সামান্য বাজারসদাই। এরপর রাতে চুলা জ্বালিয়ে রান্না করেন মা। এভাবেই চলে তাদের দিন।

চার বোন ও এক ভাইয়ের পরিবার শাবনাজদের। বড় বোন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে সম্মান শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। মেজ বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। আর সবার ছোট বোন সৈয়দপুর পাইলট বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী।

শাবনাজ জানায়, তার বাবার সামর্থ্য সীমিত। মা মোছা. লাডলি কিছুদিন আগেও মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করতেন। বর্তমানে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি আর কাজ করতে পারেন না। ফলে সংসারের পুরো দায়িত্ব বাবাকেই একা টানতে হচ্ছে।

পরিবারের ২০ বছর বয়সী একমাত্র ভাই লেখাপড়া করেনি, কোনো কাজও করে না। ফলে সেও এখন বাবার ওপর নির্ভরশীল।

ভবিষ্যতে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে কি না—এ নিয়েও শাবনাজের মনে রয়েছে অনিশ্চয়তা। তার কণ্ঠে তাই শোনা যায় অসহায় প্রশ্ন—“জানি না, ভাগ্যে লেখাপড়া আছে কি না?”

শাবনাজের মা মোছা. লাডলি বলেন, তাঁর স্বামী হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। আগে মহাজনের রিকশা চালাতেন। দুই বছর আগে একটি এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তাকে একটি ব্যাটারি রিকশা কিনে দেওয়া হয়। সেই রিকশার কিস্তি পরিশোধের পর যা থাকে, তা দিয়েই এত বড় সংসার চালাতে হয়।

তিনি বলেন, আল ফারুক একাডেমির প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম এবং শিক্ষক জালাল উদ্দিন ও মতিউর রহমান শাবনাজের পড়াশোনার বিষয়ে অনেক খেয়াল রেখেছেন। তাঁদের সহযোগিতায় মেয়ে প্রায় অর্ধেক খরচে পড়াশোনা করতে পেরেছে। সেই সহযোগিতার কারণেই শাবনাজ জিপিএ-৫ পেয়েছে বলে মনে করেন তিনি। এ জন্য বিদ্যালয়ের সব শিক্ষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান শাবনাজের মা।

শাবনাজের বাবা মো. ইসমাইল বলেন, “আমার মেয়ের জন্য দোয়া করবেন। সারাদিন রিকশা টেনে শরীরে শক্তি পাই না। এখন আমার বয়স ৫৫ বছর। মৃত্যুর আগে আমি আমার মেয়েটাকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চাই।”

আল ফারুক একাডেমির প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, শাবনাজ অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী। তার লেখাপড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল একাগ্রতা। বাবা-মায়ের কষ্টকে সে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়ে সে বাবা-মা ও শিক্ষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। তিনি শাবনাজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন।

একটি ছোট্ট ঘর, একটি খাট আর সাতজনের সংসার। অভাব যেখানে প্রতিদিনের বাস্তবতা, সেখানেই শাবনাজের জিপিএ-৫ যেন নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস জোগায়। তবে সেই স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন তার পাশে দাঁড়ানোর মতো সহযোগিতা।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর