শিরোনাম

বর্ষাতেও খরায় পুড়ছে সৈয়দপুরের ফসলের মাঠ

বর্ষাতেও খরায় পুড়ছে সৈয়দপুরের ফসলের মাঠ

বর্ষাকালেও বৃষ্টির দেখা নেই নীলফামারীর সৈয়দপুরে। টানা অনাবৃষ্টিতে খরার কবলে পড়েছে উপজেলার ফসলের মাঠ। পানির অভাবে আমনের চারা রোপণ ব্যাহত হচ্ছে, আবার আগে রোপণ করা আমনখেতও তীব্র রোদে শুকিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে শ্যালো ও মোটরচালিত সেচযন্ত্র দিয়ে জমিতে পানি দিয়ে আমন চাষ চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা।

উপজেলার কামারপুকুর, কাশিরাম বেলপুকুর, খাতামধুপুর, বাঙালিপুর ও বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পানির সংকটে কৃষকদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। অনেক কৃষক শ্যালো ও মোটর চালিয়ে জমিতে পানি দেওয়ার পর আমনের চারা রোপণ করছেন। আগাম রোপণ করা অনেক আমনখেতেও পানির অভাবে দেখা দিয়েছে বিবর্ণতা। এতে ফসলের ফলন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে।

কৃষকরা জানান, দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় জমির মাটি শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও জমিতে বড় বড় ফাটল ধরেছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে যাওয়ায় শ্যালো মেশিন বসিয়েও প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সেচের জন্য শ্যালো মেশিন মালিকদের কাছে কৃষকদের সিরিয়ামের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। অনেক সময় পানি নেওয়ার সিরিয়াল নিয়েও বাক্‌বিতণ্ডার সৃষ্টি হচ্ছে।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, সৈয়দপুরে পানির স্তর স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩ থেকে ৪ ফুট নিচে নেমে গেছে। কোথাও ৭-৮ ফুট পর্যন্ত মাটি খুঁড়ে শ্যালো মেশিন স্থাপন করেও পর্যাপ্ত পানি মিলছে না। ফলে আমন আবাদে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো চারা রোপণ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

নদী-খাল শুকিয়ে বিপাকে আমন ও পাটচাষি

দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় নদ-নদী, খাল-বিল ও নিচু জলাশয়ের পানিও কমে গেছে। এসব পানির ওপর নির্ভর করে আমন চাষ করা কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। অনেক এলাকায় সেচের বিকল্প উৎস না থাকায় আগাম রোপণ করা ধানের চারা শুকিয়ে যাচ্ছে।

একই কারণে পাট জাগ দেওয়াতেও সমস্যায় পড়েছেন কৃষকরা। কোথাও পাট কেটে জমির পাশে ফেলে রাখা হয়েছে, আবার কেউ সামান্য পানিতে পাট জাগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে পাটের মান নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শহরের অদূরে ঢেলাপীর, তারাগঞ্জ ও রানীরবন্দর হাট এলাকায় দেখা গেছে, নদী-খাল-বিলে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় মৌসুমি মাছ ধরার চাই বা স্থানীয় ভাষায় ‘ডাইরকি’র চাহিদাও কমে গেছে। বাঁশের তৈরি এসব মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে কারিগররা বসে থাকলেও ক্রেতার দেখা মিলছে কম।

সেচেও বিদ্যুতের ভোগান্তি

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। মৌসুমের শুরু থেকেই সৈয়দপুরের গ্রামাঞ্চলে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিংয়ের অভিযোগ করছেন কৃষকরা। এতে সেচযন্ত্র চালানো ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী জমিতে পানি দিতে না পারায় আমনের আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে তাদের।

কৃষকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ কখন আসবে আর কখন চলে যাবে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে সেচের জন্য শ্যালো মেশিন চালানোর সময় ঠিক করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে একদিকে পানির সংকট, অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাট—দুই সংকটে পড়েছেন তারা।

এখনো সংকটজনক পরিস্থিতি হয়নি: কৃষি বিভাগ

সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীমান ভূষণ জানান, চলতি মৌসুমে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৩০ শতাংশ জমিতে ইতোমধ্যে চারা রোপণ করা হয়েছে। বৃষ্টির অভাবে অবশিষ্ট জমিতে কৃষকরা শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে সেচ দিয়ে চারা রোপণ করছেন।

তিনি বলেন, কৃষকরা দোগাছি তৈরি করে রেখেছেন। আমন চারা রোপণের জন্য এখনো পর্যাপ্ত সময় রয়েছে। তাই এই মুহূর্তে সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে বৃষ্টির ঘাটতি অব্যাহত থাকলে সেচনির্ভরতা বাড়বে এবং উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে।

বর্ষা মৌসুমে এমন অনাবৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আমন ও পাট—দুই ফসলের উৎপাদনেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা। বিশেষ করে দ্রুত বৃষ্টি না হলে আমন আবাদ ও পাট জাগ দেওয়ার সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর