শিরোনাম

পাইপলাইন-স্টেশন সবই প্রস্তুত, তবু তিন বছরেও মেলেনি শিল্পে গ্যাস সংযোগ

পাইপলাইন-স্টেশন সবই প্রস্তুত, তবু তিন বছরেও মেলেনি শিল্পে গ্যাস সংযোগ

পাইপলাইন বসানো হয়েছে, নির্মাণ শেষ হয়েছে সিটিগেট ও গ্যাস সরবরাহ কেন্দ্রের। শিল্পাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে গ্যাসের লাইন। রেগুলেটিং, মিটারিং ও ডিআরএস নির্মাণের কাজও শেষ। কিন্তু সব প্রস্তুতি থাকার পরও প্রায় তিন বছর ধরে নীলফামারীর শিল্প-কারখানাগুলোতে দেওয়া হয়নি গ্যাস সংযোগ। ফলে প্রায় ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো পড়ে আছে অচল, আর গ্যাসের অভাবে বাড়তি খরচে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে শিল্পোদ্যোক্তাদের।

২০২৩ সালের মধ্যে নীলফামারীতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও নির্ধারিত সময়ের তিন বছর পরও গ্যাস সরবরাহ শুরু না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে উদ্যোক্তাদের মধ্যে। এতে জেলার শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকার অবকাঠামো

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালে বগুড়া-রংপুর-সৈয়দপুর গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন, তিনটি গ্যাস স্টেশন এবং নদী-খাল ক্রসিংসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়।

প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা। তবে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও নীলফামারীর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এর সুফল পাচ্ছে না।

সৈয়দপুরে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) সিটিগেট এবং পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (পিজিসিএল) সরবরাহ কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। জিটিসিএলের রেগুলেটিং ও মিটারিংয়ের কাজ এবং পিজিসিএলের ডিআরএস নির্মাণও শেষ হয়েছে। উত্তরা ইপিজেড ও সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরী পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপনের কাজও সম্পন্ন হয়েছে।

তারপরও গ্যাস সংযোগ না দেওয়ায় পুরো অবকাঠামো কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে।

স্টেশন প্রস্তুত, নেই কোনো কার্যক্রম

সরেজমিনে দেখা গেছে, সৈয়দপুরের সিটিগেট ও গ্যাস সরবরাহ কেন্দ্রের প্রধান ফটক বন্ধ। সেখানে নিরাপত্তাকর্মী ছাড়া দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সৈয়দপুর সিটিগেট ও সরবরাহ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। অবকাঠামো ও সরবরাহ সক্ষমতা প্রস্তুত থাকার পরও সংযোগ না থাকায় সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বাড়ছে শিল্পের উৎপাদন ব্যয়

গ্যাস সংযোগ না থাকায় উত্তরা ইপিজেড, সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরী, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে জ্বালানি সংগ্রহ করে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

তাদের ভাষ্য, এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, কমছে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা। নতুন শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনাও অনেকটা নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

রয়েল রিলাক্স মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ ও রানু এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজু পোদ্দার ও সুশান্ত কুমার বলেন, “কেবল আশ্বাস দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বাস্তবে গ্যাস সরবরাহ শুরু না হলে জেলার শিল্পখাত ক্ষতির মুখেই থাকবে।”

তাদের মতে, গ্যাস সংযোগ চালু হলে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

৫০ প্রতিষ্ঠানের অপেক্ষা

সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, বিসিক শিল্পনগরী ১০ দশমিক ৯৩ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেখানে প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিল্পনগরীর সামনে পর্যন্ত গ্যাসের পাইপলাইন স্থাপন করা হলেও এখনো সংযোগ দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, “আমরা একাধিকবার পিজিসিএলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। সংযোগ না থাকায় উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বর্তমানে আমরা হতাশ।”

তিন বছর ধরে শুধু আশ্বাস

নীলফামারী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও শিল্পপতি সিদ্দিকুল আলম সিদ্দিক বলেন, গ্যাস সংযোগ পেলে উত্তরা ইপিজেডসহ সৈয়দপুরে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের সুযোগ তৈরি হতো। এতে ব্যাপক কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হতে পারত।

তিনি বলেন, “তিন বছর ধরে শুধু প্রতিশ্রুতি আর প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়নের কোনো আশাই দেখা যাচ্ছে না।”

অন্যদিকে বর্তমান সংসদ সদস্য হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম বলেন, “আমরা স্টেশন পেয়েছি, লাইন পেয়েছি, গ্যাস পাচ্ছি না। যত দ্রুত সম্ভব সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবে—আমিও সেটিই চাই।”

কাজে লাগবে উত্তরাঞ্চলের শিল্প সম্ভাবনা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৈয়দপুরের সিটিগেট ও সরবরাহ কেন্দ্র থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে অব্যবহৃত অবকাঠামো কাজে লাগানোর পাশাপাশি উত্তরা ইপিজেড, বিসিক শিল্পনগরী, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে নতুন শিল্প স্থাপন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রায় তিন বছর ধরে প্রস্তুত অবকাঠামো পড়ে থাকায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—সবকিছু প্রস্তুত থাকার পরও নীলফামারীর শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংযোগ দিতে আর কত অপেক্ষা করতে হবে?

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর