একসময় খরা, অনিয়মিত বৃষ্টি ও সেচ সংকটে আউশ ধান চাষ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন নীলফামারীর কৃষকেরা। দ্রুত ফসল ঘরে তুলে আগাম আলু চাষের সুযোগ নিতে অনেকেই চায়না ধানের ওপর নির্ভর করতেন। তবে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ব্রি ধান ৯৮ চাষ করে কম সময়ে ভালো ফলন পাওয়ার পাশাপাশি আগাম আলু চাষের নতুন সম্ভাবনা দেখছেন কৃষকেরা।
নীলফামারী সদর ও কিশোরগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এবার চায়না ধানের পরিবর্তে ব্রি ধান ৯৮-এর আবাদ হয়েছে। মাঠজুড়ে ধান পাকার দৃশ্য জানান দিচ্ছে সম্ভাবনাময় ফলনের। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, স্বল্পমেয়াদি এ জাতটি সময়মতো ঘরে তুলতে পারলে কৃষকেরা আমনের পাশাপাশি রবি মৌসুমের আগাম আলু বা সরিষা চাষের জন্য বাড়তি সময় পান।
সাধারণত আগস্টের মধ্যেই ব্রি ধান ৯৮ কাটা-মাড়াই শেষ করা সম্ভব। তবে চলতি মৌসুমে কিছু এলাকায় দেরিতে রোপণ করায় সেপ্টেম্বরেও ধান কাটা-মাড়াই চলছে।
মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, নীলফামারী জেলার বাহাগিলি ইউনিয়নের খামাতপাড়া এলাকায় একসঙ্গে প্রায় ৪৫ বিঘা জমিতে ব্রি ধান ৯৮ চাষ করেছেন কৃষকেরা। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা স্বপন মণ্ডল জানান, পর্যায়ক্রমে ধান পাকায় সেভাবেই কাটা হচ্ছে। এখনো মাঠের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ধান কাটার অপেক্ষায় রয়েছে।
অন্যদিকে নিতাই ইউনিয়নের খোলাহাটি গ্রামে প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে এ জাতের ধান চাষ হয়েছে বলে জানান উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শ্যামলী বেগম। তাঁর ভাষ্য, ওই এলাকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ধান এখনো মাঠে পেকে আছে।
কচুকাটা ইউনিয়নের কৃষক মোশফিকুর জানান, বর্ষার শুরুতে সেচ সংকট থাকলেও ব্রি ধান ৯৮-এর ফলনে তেমন প্রভাব পড়েনি।
কৃষক আইয়ুব বলেন, “আগে পানির অভাবে আউস নষ্ট হতো। কিন্তু ব্রি ৯৮ লাগিয়ে কম খরচে দ্বিগুণ ফলন পেয়েছি। ধান দ্রুত ওঠায় এখন আগাম আলু লাগানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
খামাতপাড়া এলাকার কৃষক মমিনুর, জাদু, সাফিউল ও লেলিন জানান, মাত্র ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে এ ধান কাটা-মাড়াই করা যায়। জীবনকাল কম হওয়ায় সেচ ও সারও তুলনামূলক কম লাগে বলে তাঁরা জানান।
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমায়রা মণ্ডল ও কৃষিবিদ লোকমান জানান, নীলফামারী ও কিশোরগঞ্জ এলাকায় আগাম আলুর ব্যাপক আবাদ হয়। চায়না ধানের পরিবর্তে ব্রি ধান ৯৮ চাষ করে দ্রুত ধান ঘরে তুলতে পারলে আগাম আলু রোপণের সুযোগ তৈরি হয়। বাজারে আগাম আলুর দাম তুলনামূলক বেশি থাকায় এতে কৃষকেরা লাভবান হওয়ার সুযোগ পান।
কৃষি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ব্রি ধান ৯৮-এর হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৫ থেকে ৫ দশমিক ৫ টন। প্রতি বিঘায় (৩০ শতক) আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ মণ ফলন পাওয়া যায়, প্রতি মণ ধানের হিসাব ২৮ কেজি ধরে।
এ জাতের চাল মাঝারি পাতলা ও সাদা। রান্নার পর ভাত ঝরঝরে ও সুস্বাদু হয়। অন্যান্য অনেক জাতের তুলনায় পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণও কম বলে কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান।
কৃষিবিদদের মতে, স্বল্পমেয়াদি ব্রি ধান ৯৮-এর আবাদ বাড়ানো গেলে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ বাড়বে। বিশেষ করে আগাম আলু ও অন্যান্য রবি ফসলের সঙ্গে এ জাতের ধানের সমন্বিত চাষ কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সেচনির্ভর বোরো ধানের ওপর চাপ কমাতে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করতে ভূমিকা রাখতে পারে।