শিরোনাম
রংপুরজুড়ে গোপন বাণিজ্য

চায়না দুয়ারি জালে বিপন্ন দেশীয় মাছ ও জীববৈচিত্র্য

চায়না দুয়ারি জালে বিপন্ন দেশীয় মাছ ও জীববৈচিত্র্য

রংপুর বিভাগের নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ে উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল। কম দামে সহজলভ্য হওয়ায় জেলেদের একাংশের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই জাল। ফলে দেশীয় ছোট-বড় মাছ, মাছের পোনা, ডিম ও অন্যান্য জলজ প্রাণী নির্বিচারে নিধনের শিকার হচ্ছে। এতে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে জলজ জীববৈচিত্র্য এবং দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সীমান্ত এলাকা দিয়ে চোরাই পথে চায়না দুয়ারি জাল এনে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার হাট-বাজারে গোপনে বিক্রি করছেন। প্রকাশ্যে বিক্রি না হলেও নির্দিষ্ট ক্রেতাদের কাছে পাইকারি ও খুচরা সরবরাহ করা হচ্ছে এসব জাল। কম দামের কারণে অনেক প্রান্তিক জেলে ও সাধারণ মানুষ এই জালের ব্যবহার করছেন।

সন্ধ্যা নামলেই জাল পেতে মাছ শিকার

সরেজমিনে দেখা যায়, সন্ধ্যার পর থেকেই নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ে শত শত চায়না দুয়ারি জাল পেতে মাছ ধরা হচ্ছে। অতিক্ষুদ্র ফাঁসের এই জালে শুধু বড় মাছ নয়, মাছের পোনা, ডিম এবং বিভিন্ন জলজ প্রাণীও আটকা পড়ছে। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় মাছের উৎপাদন ও পরিবেশের ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

অভিযান চললেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়

রংপুর বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুজিত কুমার চ্যাটার্জি বলেন, চায়না দুয়ারি জাল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় জাল জব্দ ও ধ্বংসের পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে জাল প্রবেশ, অনলাইনে বিক্রি এবং স্থানীয় পর্যায়ে গোপন বিপণনের কারণে অভিযান চালিয়েও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া জনবল সংকট ও আইন প্রয়োগে নানা সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

বিভাগীয় কমিশনারের প্রতিক্রিয়া

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, চায়না দুয়ারি জালের বিস্তার সম্পর্কে তাঁর কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

পরিবেশের জন্য বড় হুমকি

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চায়না দুয়ারি জাল পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। উন্নতমানের প্লাস্টিক ফাইবার দিয়ে তৈরি হওয়ায় এসব জাল সহজে পচে না এবং নদী বা জলাশয়ে হারিয়ে গেলে শত শত বছর টিকে থাকে।

তিনি বলেন, অতিক্ষুদ্র ফাঁসের কারণে মাছের পোনা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী জলজ প্রাণীও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। শুধু অভিযান বা আইন প্রয়োগ করে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষ, জেলে ও ব্যবসায়ীদের সচেতন করার পাশাপাশি সীমান্ত ও অনলাইন মাধ্যমে অবৈধ জাল প্রবেশ বন্ধ, স্থানীয় বাজারে নজরদারি বৃদ্ধি এবং বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

তার মতে, দেশীয় মাছ বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অনেক দেশীয় মাছের প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়বে।

পরিসংখ্যান যা বলছে

রংপুর বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত বিভাগের আট জেলা ও ৫৮টি উপজেলায় ১২০টি অভিযান এবং ৯০টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে।

এসব অভিযানে ২ লাখ টাকার বেশি জরিমানা আদায় করা হয়েছে। একই সময়ে চায়না দুয়ারিসহ বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ সাড়ে ৩ লাখ মিটার কারেন্ট ও চায়না জাল জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে।

শুধু জুলাই মাসের ২৩ তারিখ পর্যন্ত ৪০টি অভিযানে ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং দেড় লাখ মিটার জাল ধ্বংস করা হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে প্রায় ৬ লাখ ৭৪ হাজার হেক্টর জলজ সম্পদসমৃদ্ধ এলাকা রয়েছে। এখানে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি খাল-বিল ও নদী-নালা, সাড়ে ৩ লাখের বেশি পুকুর ও দিঘি এবং ৭৭টি মাছের অভয়াশ্রম রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব জলাশয়ে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জালের বিস্তার অব্যাহত থাকলে দেশীয় মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর