সিপন আহমেদ, মানিকগঞ্জ | ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার চরকাটারি ইউনিয়নের বোর্ড বাজার এলাকায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব ডা. এম এ রশীদ উচ্চ বিদ্যালয় নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। বিদ্যালয়টির নামে নেই কোনো নিজস্ব জমি। অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী নিজস্ব জমি থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে পাঠদানের অনুমতি।
এরই মধ্যে বিদ্যালয়ের জন্য সরকারি অর্থে এক কোটি ৩১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা ভবনের ভিত্তিসহ একতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ শুরু করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর।
শুধু জমির মালিকানা নিয়েই নয়, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। চলতি বছর বিদ্যালয় থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একজনও পাস করতে পারেনি। গত বছর ১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিল মাত্র একজন।
ভাড়া করা জমিতেই বিদ্যালয়
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৭ সালে মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব ডা. এম এ রশীদের সন্তানেরা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে বিদ্যালয়টি সাবেক ইউপি সদস্য রেজাউলের ১১ শতক এবং মকবুল হোসেনের এক আত্মীয়ের ২৪ শতক জমির ওপর পরিচালিত হচ্ছে। এসব জমি বিদ্যালয়ের নামে রেজিস্ট্রি করা নয়।
স্থানীয়দের দাবি, মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতে জমিগুলো ভাড়া নেওয়া হয়েছে। প্রতি শতক জমির জন্য বছরে মাত্র ৫০০ টাকা করে ভাড়া দেওয়া হয়।
হাজিরা খাতায় ২৩৩, বাস্তবে উপস্থিতি কম
রোববার দুপুর দেড়টার দিকে বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম শেষ হয়ে গেছে। দুটি কক্ষে দুই শিক্ষক শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াচ্ছেন। প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষক-কর্মচারীদের কাউকে পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদকের পরিচয় জানার পর প্রাইভেট পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়।
বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক মোখলেসুর রহমান জানান, সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ক্লাস হয়। এরপর প্রাইভেট কোচিং চলে।
বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক জানান, হাজিরা খাতায় প্রায় ২৩৩ জন শিক্ষার্থীর নাম রয়েছে। তবে নিয়মিত উপস্থিতির সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম। শিক্ষক-কর্মচারী মিলিয়ে বর্তমানে ১১ জন কর্মরত আছেন।
অনুমতি নিয়েও প্রশ্ন
বিদ্যালয়টি ২০২৩ সালে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের অনুমতি পায়। পরে পাশের একটি বিদ্যালয়ের মাধ্যমে নিবন্ধন করে এখানকার শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
তবে চলতি বছর কতজন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে—এ তথ্য বিদ্যালয়ের গণিত ও ইংরেজি শিক্ষকও নিশ্চিতভাবে জানাতে পারেননি।
প্রধান শিক্ষক মাসুম রানার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে সাংবাদিকের পরিচয় জানালে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে ফোন রেখে দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছর ১২ জন পরীক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। গত বছর ১১ জনের মধ্যে মাত্র একজন উত্তীর্ণ হয়।
নীতিমালায় নিজস্ব জমির বাধ্যবাধকতা
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠদানের অনুমতি ও স্বীকৃতিসংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানকে পাঠদানের অনুমতি পেতে হলে প্রতিষ্ঠানের নামে নিজস্ব জমি থাকা প্রয়োজন। জমির মালিকানা, খারিজ ও খাজনা-সংক্রান্ত কাগজপত্রও দাখিল করতে হয়।
মানিকগঞ্জ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আমির হোসেন বলেন, “নিজস্ব জমি না থাকলে কোনো বিদ্যালয়ের পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার কথা নয়। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এ ধরনের অনুমতি দেওয়া হয়।”
দৌলতপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাইনুল ইসলাম বলেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন। বিদ্যালয়টি কীভাবে অনুমতি পেয়েছে, তা তার জানা নেই। তবে পাঠদানের অনুমতি পেতে হলে প্রতিষ্ঠানের নামে জমি থাকা বাধ্যতামূলক বলে জানান তিনি।
এক কোটি ৩১ লাখ টাকার ভবন, কাজ বন্ধ
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে সরকারি অর্থে নির্মাণাধীন ভবন নিয়ে। নিজস্ব জমি না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে বিদ্যালয়টির জন্য এক কোটি ৩১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা ফাউন্ডেশনসহ একতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়।
ইতোমধ্যে ভবনের বেজমেন্টের কাজ শেষ হয়েছে। তবে বিদ্যালয়টির জমির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।
মানিকগঞ্জ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী খান জিল্লুর রহমান বলেন, “বিষয়টি জানার পর কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। ঠিকাদারকে এখনো কোনো বিল দেওয়া হয়নি। বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা চলছে।”
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—নিজস্ব জমি না থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয়টি কীভাবে পাঠদানের অনুমতি পেল, কোন তদন্তের ভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়া হলো এবং জমির মালিকানা যাচাই না করেই সরকারি অর্থে ভবন নির্মাণের অনুমোদন কীভাবে এলো?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র যাচাই ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।