গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম এখন পরিচিত ‘দোলনার গ্রাম’ হিসেবে। বংশপরম্পরায় চলে আসা দোলনা তৈরির কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে এখানকার নারী-পুরুষ শুধু ঐতিহ্যই ধরে রাখছেন না, গড়ে তুলেছেন জীবিকার নতুন পথও।
পাট, রঙিন সুতা, বাঁশ ও লোহার রিং দিয়ে নানা নকশা ও রঙের দোলনা তৈরি করেন স্থানীয় কারিগররা। বিশেষ করে নারীরা সংসারের কাজের পাশাপাশি দোলনা তৈরিতে যুক্ত হয়ে পরিবারের আয় বাড়াচ্ছেন। অনেকের কাছে এই কুটির শিল্পই হয়ে উঠেছে স্বাবলম্বী হওয়ার অন্যতম মাধ্যম।
দোলনা তৈরির কাজটি বেশ শ্রমসাধ্য। প্রথমে বাঁশের চাকা কিংবা লোহার রিং দিয়ে তৈরি করা হয় মূল কাঠামো। এরপর বিভিন্ন রঙের সুতা ও পাটের দড়ি দিয়ে শুরু হয় বুনন ও নকশার কাজ। কাঠামোর ওপর সুতা ও পাটের রশি পেঁচিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় বাহারি নকশা।
কারিগররা তৈরি করেন চাক দোলনা, চেয়ার দোলনা, চারকোনা আকৃতিসহ বিভিন্ন নকশার দোলনা। ঝুলিয়ে রাখার জন্য এতে যুক্ত করা হয় মজবুত পাটের দড়ি কিংবা লোহার চেইন।
নাগরী ইউনিয়নের বিরতুল গ্রাম থেকে শুরু করে ধনুন, বাগদী, বিন্দান, সেনপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে এ শিল্প। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৩৫০টি পরিবারের সহস্রাধিক নারী-পুরুষ কোনো না কোনোভাবে দোলনা তৈরির সঙ্গে যুক্ত। তাদের হাতে তৈরি দোলনা কালীগঞ্জের স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও নওগাঁসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। স্থানীয়দের দাবি, কিছু দোলনা বিদেশের বাজারেও যাচ্ছে।
দোলনা তৈরি শেষ হওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে পাইকাররা সরাসরি কারিগরদের বাড়ি থেকে তা কিনে নিয়ে যান। ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের বিনোদনের উপকরণ হিসেবেও এসব দোলনার চাহিদা রয়েছে।
কাঁচামালের দাম বাড়ায় সংকটে কারিগররা
বাগদী এলাকার উদ্যোক্তা আইয়ুব খা বলেন, সুতা, লোহা ও রঙসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় দোলনা শিল্প বর্তমানে চাপে রয়েছে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও সে অনুযায়ী দাম বাড়ছে না। ফলে কারিগরদের টিকে থাকতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তার ভাষ্য, সরকারি উদ্যোগে সহজ শর্তে ঋণ এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে পরিবেশবান্ধব পাট ও হস্তশিল্পকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এতে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এ শিল্পের সম্ভাবনা বাড়বে।
ঘরের কাজের পাশাপাশি স্বাবলম্বী নারীরা
বাগদী গ্রামের দোলনা তৈরির কারিগর নিলুফা বেগম বলেন, একসময় গ্রামের নারীরা অনেকটাই ঘরবন্দি ছিলেন। পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব মূলত পুরুষদের ওপরই নির্ভর করত। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। সংসারের কাজ সামলানোর পাশাপাশি নারীরাও দোলনা তৈরি করে পরিবারের আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
তার মতে, এই কাজ শুধু বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেনি; নারীদের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছে।
নতুন নকশা ও সরকারি সহায়তার প্রত্যাশা
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দোলনার নকশা, রং ও আকারে আরও বৈচিত্র্য আনতে পারলে বাজারে এর চাহিদা বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ তৈরি করা গেলে এ শিল্প আরও বিস্তৃত হতে পারে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে কালীগঞ্জের দোলনা শিল্প শুধু কয়েকটি গ্রামের ঐতিহ্য হয়ে থাকবে না; এটি হয়ে উঠতে পারে কর্মসংস্থান ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি সম্ভাবনাময় মডেল।