ডোমার পৌর শহরের মেঠোপথ থেকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দোরগোড়ায়—আল নাসিরুল্লাহ সিদ্দিকী সোহানের পথচলা যেন স্বপ্নপূরণের এক অনন্য গল্প। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার এই কৃতি সন্তান এবার গুগলের পর যোগ দিয়েছেন মাইক্রোসফটে। তাঁর এই সাফল্যে প্রযুক্তি অঙ্গনে বাংলাদেশের তরুণদের সম্ভাবনার নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ গত বুধবার (২৬ আগস্ট) নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে সোহান জানান, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দিয়েছেন তিনি। এর আগে প্রায় তিন বছর নয় মাস বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগলে কাজ করেছেন তিনি।
গত ২৪ আগস্ট মাইক্রোসফটে নতুন কর্মজীবন শুরু করেন সোহান। এর আগে গুগলের পোল্যান্ড অফিসে সাইট রিলায়েবিলিটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির ডাবলিন অফিসে কাজ করেন তিনি।
ডোমারের মেঠোপথ থেকে বিশ্বপ্রযুক্তির মঞ্চে
সোহানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা নীলফামারীর ডোমার পৌর শহরের পল্টনপাড়া এলাকায়। তাঁর বাবা মো. হামিদার রহমান সাবেক ভূমি কর্মকর্তা এবং মা উম্মে আয়েশা সিদ্দিকা গৃহিণী।
ডোমার বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে এসএসসি এবং ২০১৩ সালে রংপুর সরকারি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন সোহান। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (CSE) বিভাগে। সেখান থেকে ২০১৮ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষ করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান অরবিটেকস ও স্যামসাং বাংলাদেশের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ২০২০ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান জার্মানিতে।
জার্মানির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব ডর্টমুন্ডে ডেটা সায়েন্সে স্নাতকোত্তর করার সময় থেকেই আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজের প্রস্তুতি শুরু করেন সোহান। কঠোর পরিশ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে শত শত প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে ২০২২ সালে গুগলের পোল্যান্ড অফিসে সাইট রিলায়েবিলিটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন।
পরবর্তীতে গুগলের ডাবলিন অফিসে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। প্রায় তিন বছর নয় মাস গুগলে কাজের অভিজ্ঞতার পর এবার মাইক্রোসফটে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন এই তরুণ প্রযুক্তিবিদ।
পরিবারে আনন্দ, স্কুলে গর্ব
সোহানের এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত তাঁর পরিবার ও শৈশবের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা মো. হামিদার রহমান দেশবাসীর কাছে তাঁর ছেলের জন্য দোয়া চেয়েছেন।
ডোমার বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. রুহুল আমিন বলেন, “সোহান ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও লক্ষ্যভেদী ছিল। বিশ্বমঞ্চে ওর এই নতুন প্রাপ্তি শুধু আমাদের স্কুলের জন্য নয়, পুরো দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বিরাট অনুপ্রেরণা।”
প্রান্তিক শহর থেকেও বিশ্বজয়
প্রযুক্তির বিশ্বে যেখানে প্রতিযোগিতা তীব্র, সেখানে বাংলাদেশের একটি ছোট শহর ডোমার থেকে উঠে এসে গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে জায়গা করে নেওয়া সোহানের গল্প নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার।
তাঁর পথচলা দেখিয়ে দেয়—সুযোগের পরিধি শুধু রাজধানী বা বড় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইচ্ছাশক্তি, ধারাবাহিক পরিশ্রম, দক্ষতা অর্জন এবং সঠিক প্রস্তুতি থাকলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বিশ্বপ্রযুক্তির মঞ্চে পৌঁছানো সম্ভব।
আল নাসিরুল্লাহ সিদ্দিকী সোহানের এই সাফল্য তাই শুধু একজন তরুণের ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের সম্ভাবনারও একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।