শিরোনাম

কফি, কোকো ও রাম্বুটান চাষে উত্তরাঞ্চলে দৃষ্টান্ত খাদিজা আক্তার

কফি, কোকো ও রাম্বুটান চাষে উত্তরাঞ্চলে দৃষ্টান্ত খাদিজা আক্তার

স্বামী হারানোর পর সংসারের হাল ধরতে শুরু করেছিলেন কৃষিকাজ। সেই সংগ্রামই আজ তাঁকে এনে দিয়েছে জাতীয় স্বীকৃতি। কফি, রাম্বুটান, কোকো, ড্রাগন, অ্যাভোকাডো, প্যাশন ফল, সফেদাসহ ২৪ প্রজাতির ফল চাষ করে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের সুনগর গ্রামের খাদিজা আক্তার (৬০)।

নিজের উদ্ভাবনী চিন্তা, কঠোর পরিশ্রম ও কৃষির প্রতি ভালোবাসায় তিনি শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, উত্তরাঞ্চলে বিকল্প ফলচাষেরও একটি সফল মডেল তৈরি করেছেন।

২০১৪ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। কীভাবে পরিবার চালাবেন, সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বাড়ির পাশের জমিতে শুরু করেন মিশ্র ফলের বাগান। প্রথমে পাশের কিশোরগঞ্জ উপজেলা থেকে আরাবিকা জাতের কফির চারা সংগ্রহ করেন। কয়েক বছরের মধ্যেই গাছে ফল আসে। সেই ফল প্রক্রিয়াজাত করে কফির গুঁড়া তৈরি করে অনলাইন ও অফলাইনে বিক্রি শুরু করেন।

তাঁর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে কৃষি বিভাগ তাঁকে প্রায় দেড় হাজার রোবাস্টা জাতের কফির চারা এবং কফি প্রক্রিয়াজাতকরণের একটি মেশিন সরবরাহ করে। বর্তমানে তিনি প্রতি কেজি কফির গুঁড়া প্রায় ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। পাশাপাশি কফির চারা প্রতিটি ১০০ টাকা এবং রাম্বুটানের চারা ৭০০ টাকায় বিক্রি করছেন।

সরেজমিনে তাঁর বাগানে গিয়ে দেখা যায়, কফি, রাম্বুটান, কোকো, ড্রাগন, সফেদা, অ্যাভোকাডো, প্যাশন ফলসহ নানা বিদেশি ফলের সমারোহ। থোকা থোকা কফির ফল, ফলভর্তি কোকো গাছ ও রঙিন ড্রাগন ফল নজর কাড়ে যে কারও। পাশাপাশি রয়েছে কাটিমন, ব্যানানা ও বারি-৪ জাতের আমের বাগানও।

খাদিজা আক্তার জানান, বাগানের আয় দিয়েই তিনি দুই ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করেছেন এবং সংসারকে স্বাবলম্বী করেছেন। তাঁর ছেলে শেফায়েত নাশরাত নয়ন কৃষি বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে এখন বাগান সম্প্রসারণ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করছেন।

তিনি বলেন, “ধৈর্য, পরিশ্রম আর আন্তরিকতা থাকলে সফলতা আসবেই। নিরাপদ ও বিষমুক্ত ফল উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েই আমি কাজ করছি। কৃষির পাশাপাশি অ্যাকুরিয়াম মাছ, গরু-ছাগল পালন এবং পুষ্টিবাগানও পরিচালনা করছি।”

বর্তমানে তাঁর বাগানে নারী-পুরুষ মিলিয়ে তিনজন শ্রমিক সারা বছর কাজ করেন।

খাদিজা আক্তারের এই সাফল্য ইতোমধ্যে জাতীয় পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০২২ সালে তিনি ‘জয়িতা’ সম্মাননা অর্জন করেন। একই বছর মৎস্য খাতে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য উৎপাদক হিসেবেও সনদ পেয়েছেন।

জলঢাকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, “২০১৮ সাল থেকে কৃষি বিভাগ তাঁকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। এখন তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা। তাঁকে দেখে অনেকেই নতুনভাবে ফলচাষে আগ্রহী হচ্ছেন।”

নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোছা. হোমায়রা মণ্ডল বলেন, “খাদিজা আক্তার নীলফামারীর গর্ব। কফি চাষ দিয়ে শুরু করে তিনি এখন কোকো, রাম্বুটান, প্যাশন ফল, সফেদাসহ নানা বিদেশি ফল সফলভাবে উৎপাদন করছেন। একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর এই অর্জন সত্যিই অনুকরণীয়। আগামীতে বেগম রোকেয়া পদকের জন্যও তাঁর নাম মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।”

সংগ্রাম, সাহস এবং উদ্ভাবনী কৃষিচর্চার মাধ্যমে খাদিজা আক্তার আজ শুধু একজন সফল নারী উদ্যোক্তা নন; তিনি উত্তরাঞ্চলে আধুনিক ও বিকল্প কৃষির এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণার নাম।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর