নীলফামারীর চিলাহাটি থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর পর্যন্ত রেলপথে ১১টি স্টেশনের মধ্যে ৬টির কার্যক্রম প্রায় দুই দশক ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে এসব এলাকার যাত্রীদের দূরের স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় ও অর্থ ব্যয় বাড়ছে, তেমনি পরিত্যক্ত স্টেশনগুলোর অবকাঠামো নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অপরাধপ্রবণতাও বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, চিলাহাটি-পার্বতীপুর রেলপথে সৈয়দপুর, খয়রাতনগর, দারোয়ানী, নীলফামারী কলেজ, নীলফামারী, তরুণীবাড়ী, ডোমার, মীর্জাগঞ্জ, চিলাহাটি, বেলাইচন্ডী ও পার্বতীপুরসহ মোট ১১টি স্টেশন রয়েছে। জনবল সংকটের কারণে প্রায় ২০ বছর ধরে খয়রাতনগর, দারোয়ানী, নীলফামারী কলেজ, তরুণীবাড়ী, মীর্জাগঞ্জ ও বেলাইচন্ডী স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
বর্তমানে চিলাহাটি থেকে সৈয়দপুর হয়ে ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহী রুটে ছয় জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন এবং একটি মেইল ট্রেন চলাচল করে। আগে এ রুটে দুটি লোকাল ট্রেন চললেও লোকসানের অজুহাতে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়ে যায় ছয়টি স্টেশনের কার্যক্রমও।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় যাতায়াতে দুর্ভোগ বেড়েছে। একই সঙ্গে রেলওয়ের ভবন, লুপলাইন ও অন্যান্য অবকাঠামো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। অনেক জায়গায় রেলের জমিও বেদখলের শিকার হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বন্ধ স্টেশনগুলোর অব্যবহৃত অবকাঠামো ও সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। তবে এসব সম্পদ সংরক্ষণ বা স্টেশনগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।
সরেজমিনে খয়রাতনগর ও দারোয়ানী স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, আধাপাকা টিনশেড ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। টিকিট কাউন্টার, স্টেশনমাস্টারের কক্ষ ও যাত্রী বিশ্রামাগার দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। কোথাও কোথাও স্টেশন চত্বর গো-চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভাষাসৈনিক ও যুক্তফ্রন্ট সরকারের সাবেক মন্ত্রী খয়রাত হোসেনের নামে নামকরণ করা খয়রাতনগর স্টেশনটি একসময় ছিল এলাকার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র। বর্তমানে সেখানে কোনো ট্রেন থামে না। রাতে স্টেশন চত্বরে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে, যা আইনশৃঙ্খলার জন্যও উদ্বেগের কারণ।
স্থানীয় বাসিন্দা অহিদুর রহমান বলেন, খয়রাতনগর স্টেশন থেকে উত্তরা ইপিজেডের দূরত্ব মাত্র এক কিলোমিটার। স্টেশনটি চালু করে ইপিজেড পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
দারোয়ানী এলাকার বাসিন্দা আলী হোসেন বলেন, একসময় ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা এই স্টেশন থেকেই স্থানীয় কৃষকদের সবজি দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতেন। স্টেশনটি বন্ধ হওয়ার পর সেই বাণিজ্যিক কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ডাবল লাইন থাকলেও মধ্যবর্তী স্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় ট্রেন ক্রসিংয়ের সুযোগ সীমিত হয়েছে। ফলে একটি ট্রেনকে অন্য ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, যা পুরো রেল চলাচলের সময়সূচিতে প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় অবকাঠামো ও যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে এবং রেলের জমি বেদখলের ঝুঁকিও বাড়ছে।
সৈয়দপুর রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার ওবাইদুল ইসলাম রতন বলেন, বর্তমানে উত্তরা লোকাল ট্রেন শান্তাহার থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত চলাচল করে। ট্রেনটি চিলাহাটি পর্যন্ত সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে বন্ধ স্টেশনগুলোতে আবারও ট্রেনের যাত্রাবিরতি দেওয়া সম্ভব হবে। এতে যাত্রীসেবা বাড়বে, আন্তঃনগর ট্রেনে বিনা টিকিটে ভ্রমণ কমবে, সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে এবং শত কোটি টাকার রেলসম্পদও সুরক্ষিত থাকবে।