মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলায় শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষার কার্যক্রম। উপজেলার ১০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৬টিতে নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। এ ছাড়া সহকারী শিক্ষকের ৭৭টি পদ শূন্য রয়েছে। শূন্য পদের বড় অংশই চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে। ফলে শিক্ষকস্বল্পতা নিয়ে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে এক-দুজন শিক্ষককে দিয়ে চলছে পাঠদান, ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিখন কার্যক্রম।
শুধু বিদ্যালয়গুলোতেই নয়, জনবল সংকট দেখা দিয়েছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়েও। কার্যালয়ের অনুমোদিত ১০টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র চারজন। সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার চারটি পদের মধ্যে দুটি শূন্য। এ ছাড়া সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর ও উচ্চমান সহকারী-কাম-হিসাবরক্ষকসহ বিভিন্ন পদ খালি থাকায় দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি দুর্গম চরাঞ্চলে রয়েছে যাতায়াতের দুর্ভোগ, আবাসন সংকট, নদীভাঙন, অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্ক। এসব কারণে শিক্ষকদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে পাঠদানে, বিশেষ করে সাধারণ ও অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবকেরা।
উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম নৌপথ। অনেক শিক্ষককে প্রতিদিন সমতল এলাকা থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌযানে নদী পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। নৌযানের সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া ও নৌযান মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে তাঁদের ভোগান্তিতে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন ও বন্যার কারণে এ দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। প্রতিকূল আবহাওয়ায় অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।
২৯ নম্বর চরভারেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হক বলেন, “আমার বিদ্যালয়ে সাতজন শিক্ষকের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন। প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। দ্রুত শিক্ষক পদায়ন না করা হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”
তিনি জানান, ৩০ নম্বর যদুদূর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচটি, ৬১ নম্বর দক্ষিণ চরভারেঙ্গায় চারটি, ৩১ নম্বর যমুনা চরকাটারীতে চারটি, ৫ নম্বর বাঘুটিয়ায় পাঁচটি, ৩৩ নম্বর চরকাটারীতে চারটি এবং ৫৪ নম্বর চরকালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনটি শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। চরাঞ্চলের আরও কয়েকটি বিদ্যালয়েও শিক্ষক সংকট প্রকট।
চরাঞ্চলে কর্মরত শিক্ষকদের অভিযোগ, দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষ যাতায়াত সুবিধা বা দুর্গম এলাকার ভাতা নেই। ফলে নৌপথে যাতায়াতের খরচ ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার শারীরিক ক্লান্তি তাঁদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল থাকায় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগেও সমস্যা হয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে শিক্ষক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
৮০ নম্বর চরকাটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রহিম বলেন, চরাঞ্চলের শিক্ষা কার্যক্রম গতিশীল করতে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এসব এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদায়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্গম এলাকার শিক্ষকদের জন্য চরভাতা চালুর দাবিও জানান তিনি।
সরেজমিনে কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও এক-দুজন শিক্ষক দিয়ে পুরো বিদ্যালয়ের পাঠদান চালানো হচ্ছে। প্রধান ও সহকারী শিক্ষকের সংকটের পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজের চাপেও ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত পাঠদান। দ্রুত প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি এবং নতুন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পর চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদায়নের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকেরা।
দৌলতপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর ফিরোজ বলেন, অবসর, বদলি, মৃত্যু ও মামলাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রধান শিক্ষকের পদগুলো শূন্য হয়েছে। শূন্য পদের তালিকা ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়েও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ ছয়টি পদ শূন্য রয়েছে। শিক্ষক সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে চরাঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষক পদায়নের অনুরোধ করা হয়েছে। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
শিক্ষক ও স্থানীয়দের মতে, দুর্গম চরাঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষক পদায়ন, যাতায়াত সুবিধা, আবাসন ও বিশেষ ভাতা নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘদিনের এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া না হলে চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।