মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে নতুন মৌসুমের আবাদ এখনো পুরোদমে শুরু হয়নি। কোথাও আমন ধান মাঠে রয়েছে, কোথাও আবার জমিতে পানি জমে আছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, শিমুলিয়া, উলাইল ও মহাদেবপুর ইউনিয়নে আবাদ শুরু হতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। অন্যদিকে শিবালয়, আরুয়া, তেওতা ও উথুলি ইউনিয়নে নতুন ফসলের আবাদ শুরু হতে সময় লাগবে প্রায় দুই মাস।
এর মধ্যেই আগাম আবাদ শুরুর কথা বিবেচনায় শিমুলিয়া, উলাইল ও মহাদেবপুর ইউনিয়নে চলতি অক্টোবরের জন্য তুলনামূলক বেশি রাসায়নিক সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের যাতে মৌসুমের শুরুতে সারসংকটে পড়তে না হয়, সে লক্ষ্যেই এ অতিরিক্ত বরাদ্দ বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
তবে মাঠে গিয়ে পাওয়া গেছে ভিন্ন চিত্র। কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার কিনতে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় জৈব সার কিংবা ‘হিউমিক সুপার’ নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। এসব পণ্য না কিনলে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কৃষক।
গত শনিবার শিমুলিয়ার তাড়াইল বাজারে কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, দুই বস্তা পটাশ নিতে গেলে তাদের সঙ্গে এক বস্তা জৈব সার অথবা দুই প্যাকেট হিউমিক সুপার কেনার কথা বলা হয়েছে। জমিতে এসব পণ্যের প্রয়োজন নেই জানালেও রাসায়নিক সার পাওয়ার স্বার্থে শেষ পর্যন্ত সেগুলো কিনতে হয়েছে বলে দাবি তাদের।
শিমুলিয়ার পাশাপাশি উলাইল ইউনিয়নের টেপড়া এলাকাতেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। শনিবার বিকেল ও রোববার সকালে সাহা ট্রেডার্সে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে। তাদের অভিযোগ, রাসায়নিক সারের সঙ্গে জৈব সার না নিলে প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ করা হচ্ছে না।
দুই বস্তা পটাশের সঙ্গে এক বস্তা জৈব সার?
শনিবার দুপুরে তাড়াইল বাজারের আলামিনের হক ট্রেডার্সে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন কৃষক সার কিনছেন। কেউ কেউ অটোরিকশায় করে সার নিয়ে যাচ্ছেন।
পাচুরিয়া গ্রামের কৃষক পান্নু, সুমন ও সাঈদের দাবি, জমির প্রয়োজন অনুযায়ী শুধু রাসায়নিক সার কিনতে চাইলেও তাদের সঙ্গে অতিরিক্ত সার নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও রাসায়নিক সার পাওয়ার জন্য জৈব সার ও হিউমিক সুপার কিনতে হয়েছে বলে জানান তারা।
কয়েকজন কৃষক বলেন, তাদের বাড়িতে পর্যাপ্ত গোবর রয়েছে এবং সেটিই তারা জমিতে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে দোকান থেকে আলাদা করে জৈব সার কেনার প্রয়োজন তাদের নেই।
তবে কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডিলার আলামিন। তাঁর দাবি, কৃষকের চাহিদা অনুযায়ীই সার দেওয়া হচ্ছে। কেউ জৈব সার বা হিউমিক সুপার নিতে না চাইলে তাকে জোর করা হচ্ছে না।
এ সময় তাড়াইল বাজারে উপস্থিত ছিলেন শিমুলিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্লক অফিসার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন। কৃষকদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, কৃষকেরা তাকে জানিয়েছেন যে অপ্রয়োজনীয় জৈব সার ও হিউমিক সুপার নিতে তাদের বাধ্য করা হচ্ছে। বিষয়টি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে জানাবেন বলেও জানান তিনি।
একজন ডিলারকে বরাদ্দ ২২২ টন সার
কৃষি বিভাগের বরাদ্দসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে শিমুলিয়া ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার আলামিনকে মোট ২২২ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে টিএসপি ৫২ টন, ডিএপি ১০৬ টন এবং এমওপি ৬৪ টন।
বরাদ্দের অর্ধেক—টিএসপি ২৬ টন, ডিএপি ৫৩ টন ও এমওপি ৩২ টন—পাশের মহাদেবপুর ইউনিয়নের কৃষকদের মধ্যে বিতরণের নির্দেশ রয়েছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোতে আবাদ শুরুর সময় এবং সম্ভাব্য কৃষি চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সার বরাদ্দ করা হয়েছে।
উলাইলেও বাড়তি সার কেনার অভিযোগ
উলাইল ইউনিয়নের টেপড়া এলাকার সাহা ট্রেডার্সে গিয়ে কয়েকজন কৃষকের কাছ থেকেও একই অভিযোগ পাওয়া যায়। তাদের ভাষ্য, রাসায়নিক সার কিনতে গেলে সঙ্গে জৈব সার নেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কৃষক বলেন, তাদের বাড়িতে পর্যাপ্ত গোবর রয়েছে। কিন্তু দোকান থেকে রাসায়নিক সার নিতে গেলে জৈব সার না কিনলে প্রয়োজনীয় সার দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই জৈব সার কিনতে হয়েছে।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি সাহা ট্রেডার্সের মালিক রতন সাহা।
উলাইলের বরাদ্দের সার ঘিওরে বিক্রির অভিযোগ
উলাইল ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দ করা সার পাশের ঘিওর উপজেলায় বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। মৌহালী গ্রামের কৃষক মজনুর কাছে ৩০ বস্তা বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সার বিক্রির সময় আরও ২০ বস্তা জৈব সার নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি স্বীকার করে রতন সাহা বলেন, মৌহালী তাঁর শ্বশুরবাড়ির এলাকা। মজনু সেখানে সার না পাওয়ার কথা জানিয়ে রাসায়নিক সারের সঙ্গে ২০ বস্তা জৈব সার নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এ কারণেই তাকে সার দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অক্টোবরের শুরুতেই ‘শেষ’ টিএসপি
টেপড়া এলাকার সাহা ট্রেডার্সে গিয়ে দেখা যায়, পটাশ, ডিএপি ও ইউরিয়া থাকলেও টিএসপি নেই। কয়েকজন কৃষক জানান, তাদের টিএসপি প্রয়োজন হলেও দোকানে তা পাওয়া যাচ্ছে না।
ডিলার রতন সাহা জানান, অক্টোবর মাসে তার দোকানের জন্য ৩০ টন টিএসপি বরাদ্দ ছিল। ইতোমধ্যে সেই সার শেষ হয়ে গেছে। তবে জরুরি প্রয়োজনে ৫০ বস্তা টিএসপি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
অক্টোবরের শুরুতেই একটি ইউনিয়নের একজন ডিলারের ৩০ টন টিএসপি শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শিমুলিয়া, উলাইল ও মহাদেবপুর ইউনিয়নে এখনো বড় পরিসরে নতুন মৌসুমের আবাদ শুরু হয়নি।
কৃষকদের অপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ এবং মৌসুমের শুরুতেই টিএসপি শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শিবালয় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুজন কুমার ভৌমিক বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।