লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত নানা সংকটের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে কৃষি, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের গ্রামীণ নারীরা। দেশীয় বীজ সংরক্ষণ, বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন, স্থানীয় কৃষিজ্ঞান চর্চা এবং প্রকৃতি রক্ষায় তাঁদের নিরলস ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ২৫ জন সংগ্রামী নারীকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
‘গ্রামীণ নারীর উত্থান, সহনশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণ’ প্রতিপাদ্যে বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল ১০টায় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের আকাশলীনা ইকোট্যুরিজম সেন্টার প্রাঙ্গণে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
জাতীয় পরিবেশ পদকপ্রাপ্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ও গ্রিন কোয়ালিশন যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
গ্রিন কোয়ালিশন সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি আবু আফফান রোজ বাবুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ গাজী।
আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্ত কৃষাণী অল্পনা রানী মিস্ত্রি, গ্রিন কোয়ালিশনের উপদেষ্টা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জি, শ্যামনগর পৌরসভা গ্রিন কোয়ালিশনের সভাপতি কৃষ্ণানন্দ মুখার্জি, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়ালিউল ইসলাম, অধ্যাপক শাহানা হামিদ, শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি সামিউল আজম মনির এবং উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুদ্দিন সিদ্দিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধি, কৃষক, শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক, উন্নয়নকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও তরুণ নেতৃত্বের সদস্যরা অংশ নেন।
আলোচকেরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা ও পরিবেশগত সংকট উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। এমন পরিস্থিতিতেও গ্রামীণ নারীরা তাঁদের অভিজ্ঞতা, ঐতিহ্যবাহী কৃষিজ্ঞান ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষি ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
তাঁরা দেশীয় বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, স্থানীয় শস্য ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য রক্ষা, কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যাভিত্তিক চাষাবাদ, জৈব ও বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন এবং পারিবারিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে কাজ করছেন। পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, স্থানীয় কৃষিপ্রযুক্তির বিকাশ, খাদ্যনিরাপত্তা ও নারীর ক্ষমতায়নেও তাঁদের অবদান উল্লেখযোগ্য।
আলোচকদের মতে, সীমিত সম্পদ ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও এসব নারীর উদ্যোগ উপকূলীয় মানুষের টিকে থাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
ঐতিহ্যবাহী কৃষিজ্ঞান ও স্থানীয় সম্পদের প্রদর্শনী
সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের পাশাপাশি নারীদের ঐতিহ্যবাহী কৃষিজ্ঞান, স্থানীয় উদ্ভাবন ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনচর্চা তুলে ধরতে দিনব্যাপী প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
প্রদর্শনীতে দেশীয় জাতের বীজ, অচাষকৃত শাক ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য, পরিবেশবান্ধব কৃষিপ্রযুক্তি, জৈব কৃষি উপকরণ, স্থানীয় ফলমূল ও শাকসবজি, ঐতিহ্যবাহী পিঠা, জ্বালানিসাশ্রয়ী চুলা এবং নারীদের তৈরি কুটির ও হস্তশিল্পসামগ্রী স্থান পায়।
এসব উপকরণের মাধ্যমে নারীদের কৃষিদক্ষতা, সৃজনশীলতা, স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংরক্ষিত জ্ঞানের পরিচয় তুলে ধরা হয়।
আয়োজকেরা বলেন, গ্রামীণ নারীরা পরিবারের খাদ্য ও জীবিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় বীজ, কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অথচ তাঁদের শ্রম ও অবদান অনেক সময় যথাযথ স্বীকৃতি পায় না।
তাঁরা নারীদের কাজের স্বীকৃতি, অধিকার প্রতিষ্ঠা, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বকে কাজে লাগানো গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করে আরও টেকসই উপকূল গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলেও মত দেন তাঁরা।
সম্মাননাপ্রাপ্ত কৃষাণী মিতা রানী, সরমা রানী, পারুল রানী বৈদ্য, শেফালী বেগম ও দেলোয়ারা বেগম তাঁদের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “বারসিক ও গ্রিন কোয়ালিশনের এই সম্মাননা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের ও আনন্দের। এর মাধ্যমে উপকূলের হাজারো নারী আরও উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হবেন। একই সঙ্গে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বেড়ে গেল। আমরা উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর মানুষের কল্যাণে এবং দেশের উন্নয়নে আরও বেশি কাজ করে যেতে চাই।”
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, উপকূলের এসব নারীর সংগ্রাম ও সাফল্য প্রমাণ করে, যথাযথ স্বীকৃতি ও সহযোগিতা পেলে স্থানীয় জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে কৃষি, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে আরও বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব। তাঁদের এই পথচলা উপকূলের টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে নতুন প্রেরণা জোগাবে।