বয়স যে শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না, তার প্রমাণ দিয়েছেন নীলফামারীর ডিমলার শেফালী বেগম। ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি, সংসারের দায়িত্ব ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তাঁর এই সাফল্যে গর্বিত পরিবার। বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া নাতনি শারাফি রাজের কাছে এখন দাদিই সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
দাদীর সাফল্যে উচ্ছ্বসিত শারাফি রাজ বলে, “আমার দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ৫২ বছর বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন—এতে আমি ভীষণ খুশি ও গর্বিত। দাদির এই সাফল্য দেখে আমিও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, মন দিয়ে চেষ্টা করলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।”
গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী শেফালী বেগমের শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল সম্ভাবনাময়। তবে ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর পারিবারিক সংকটের কারণে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয় তাঁকে। পরে স্বামী ও তিন সন্তানের মা হিসেবে পারিবারিক ব্যস্ততার মধ্যেই চাপা পড়ে যায় নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন।
তবে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাননি শেফালী। ভাগ্নি ও সন্তানদের পড়াশোনা দেখে আবারও লেখাপড়া শুরু করার ইচ্ছা জাগে তাঁর। স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহ ও সহযোগিতায় দীর্ঘ বিরতির পর বই হাতে তুলে নেন। সংসারের কাজ সামলে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে অবশেষে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ অর্জন করেন।
শেফালী বেগমের বড় ছেলে আব্দুর রাজ শাফি দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। মেয়ে মাখসূরা খানম নাজমুন পড়াশোনা করছেন রংপুর সরকারি কলেজে। পরিবারের সদস্যদের মতে, সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার স্বপ্নও বাস্তবায়ন করেছেন শেফালী।
গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রভাষক আব্দুল মান্নান বলেন, শেফালী বেগমের এই সাফল্য সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা। নিয়মিত অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল থাকলে জীবনের যেকোনো বয়সেই সাফল্য অর্জন সম্ভব।
নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে শেফালী বেগম বলেন, “ছোটবেলায় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলেও নিজের ভেতরের ইচ্ছাটা হারিয়ে যায়নি। স্বামী ও সন্তানদের সহযোগিতায় আজ এইচএসসি পাস করে মনে হচ্ছে, জীবনের একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হলো। আমি এখানেই থেমে থাকতে চাই না। সুযোগ পেলে উচ্চশিক্ষাও চালিয়ে যেতে চাই।”
শেফালীর স্বামী মকছেদুল আলম বলেন, “শেফালী পরিবারের জন্য নিজের অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করেছে। দীর্ঘদিন পর সে নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। ভবিষ্যতেও তাঁর পড়াশোনার পথে আমরা সবাই পাশে থাকব।”
শেফালী বেগমের এই অর্জন তাঁর পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে নাতনি শারাফি রাজের মনেও নতুন স্বপ্ন জাগিয়েছে। দাদীর সাফল্য দেখে সেও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চায়।