‘দখল-দূষণমুক্ত, প্রবহমান ও জীবন্ত নদী চাই’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে বিশ্ব নদী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় নদী দখল ও দূষণ বন্ধ, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন রোধ, নদী পুনঃখনন এবং জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় দেবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ হলরুমে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) দেবীগঞ্জ উপজেলা শাখার আয়োজনে এবং বাপা পঞ্চগড় জেলা শাখার সহযোগিতায় এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বাপা দেবীগঞ্জ উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নাজমুস সাকিব মুনের সঞ্চালনায় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজীৎ সাহা। বিশেষ অতিথি ছিলেন দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুসা মিয়া, বাপা পঞ্চগড় জেলা শাখার সভাপতি এ. কে. এম. আনোয়ারুল ইসলাম খায়ের ও সাধারণ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম জুয়েল।
সভায় বাপা দেবীগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি হরিশ চন্দ্র রায়, দেবীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন কবির রাজু, সিনিয়র সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম শহিদ, বাপা পঞ্চগড় জেলা শাখার নির্বাহী সদস্য মাজেদুল ইসলাম আকাশসহ শিক্ষক, পরিবেশকর্মী, বাপার সদস্য ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
স্বাগত বক্তব্যে হরিশ চন্দ্র রায় বলেন, পঞ্চগড়ের অনেক নদী বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। একসময় জেলায় প্রায় ৫০ থেকে ৫৩টি নদী থাকলেও বর্তমানে ৩০ থেকে ৩২টির অস্তিত্ব রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এসব নদীতে আগের মতো পানি নেই এবং অবশিষ্ট নদীগুলোও দূষণের শিকার হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আলোচনায় এনসিপির দেবীগঞ্জ উপজেলা মুখ্য সমন্বয়ক মাসুদ পারভেজ অভিযোগ করেন, করতোয়া সেতুর কাছাকাছি এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। রাঙ্গাপানি নদীতে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙন দেখা দিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। দ্রুত নদী পুনঃখনন করা না হলে ভাঙন আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
দেবীগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সালাম বলেন, ছাতনাই, ঢেপা, রাঙ্গাপানি, কুড়ুম ও বুড়ি তিস্তা নদীর ইতিহাস ও পরিচয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। উফেলার বীজিডাঙ্গায় খাল দখল করে বাড়ি নির্মাণের ফলে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। পাশাপাশি নদী ও জলাশয়ে মুরগির বর্জ্য ফেলার কারণে দূষণ বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পরিবেশকর্মী আলামিন অভিযোগ করেন, বিভিন্ন স্থানে এস্কেভেটর দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। সোনাহারে বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে এবং অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে নদীতে চর জেগে উঠছে বলে দাবি করেন তিনি। শালডাঙ্গার অমরখানায় ফুওয়াং কোম্পানির বিরুদ্ধে নদীতে বাঁধ দিয়ে নদীর জায়গা দখলের অভিযোগও তোলেন তিনি।
পরিবেশকর্মী ওয়াসিম আকরাম বলেন, নদীতে নিয়মিত প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলা হচ্ছে। কুড়ুম নদীর উজানে নদীর জায়গা দখল করে বসতবাড়ি নির্মাণের অভিযোগও করেন তিনি। অমরখানায় করতোয়া নদীর জায়গা দখলের বিষয়টি নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সভায় পরিবেশকর্মী ইয়াসিন নদীতে ফাঁদ পেতে বক শিকার বন্ধ এবং জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান। ওয়ারেছুর রহমান নয়ন গাজকাটিতে বন বিভাগের বাগান কেটে ফেলার বিষয়টি তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও ইন্দ্রজীৎ সাহা বলেন, নদী রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি নাগরিক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সচেতনতা এবং জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন। নদী দখল, দূষণ ও ভাঙন রোধে সবার সহযোগিতা প্রশাসনের কার্যক্রমকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রশাসন নদী রক্ষায় কাজ করছে। শালডাঙ্গায় ফুওয়াং কোম্পানির কাছ থেকে নদী দখলমুক্ত করতে প্রশাসন দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান তিনি।