গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বেগম রাবেয়া আহমেদ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বেতন, পরীক্ষার ফি ও সেশন ফি আদায়, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও মেরামতকাজ, বিল-ভাউচার এবং এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণসহ বিভিন্ন খাতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, দুই সহকারী শিক্ষক, অফিস সহকারী ও সাবেক অভিভাবক সদস্যের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এনে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ছয় শিক্ষক।
গত ২৪ মে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেন বিদ্যালয়ের ছয় সহকারী শিক্ষক। অভিযোগে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিভাষ কুমার সাহা, সাবেক অভিভাবক সদস্য ইকবাল হোসেন নিলু, সহকারী শিক্ষক শাহানাজ পারভীন ও মৃত্যুঞ্জয় দত্ত এবং অফিস সহকারী মানস কুমার গুনের নাম উল্লেখ করা হয়। অভিযোগকারীরা এসব অনিয়ম তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অভিযোগে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরের বেতন-ভাতা বাবদ ৩ লাখ ২১ হাজার ৬২০ টাকা নগদে পরিশোধ করা হলেও একই পরিমাণ অর্থ ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ব্যাংক হিসাব থেকে চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন আর্থিক খাত দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, বিদ্যালয়ের পূর্ব পাশের পুরোনো সীমানাপ্রাচীর ও ভবন মেরামতের নামে ব্যয়ের অসঙ্গতি, হিসাবের সঙ্গে খরচের গরমিল এবং ভাউচারে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে এক দোকান থেকে পণ্য কিনে অন্য দোকানের ভাউচার ব্যবহার, বিদ্যালয়ের মাসিক ব্যয়ের হিসাব নিয়মিত সমন্বয় না করা এবং ২০২৪ সালের ভাতা বিতরণ রেজিস্টারের রেভিনিউসহ স্বাক্ষরযুক্ত কয়েকটি পাতা ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগও করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষের তালা একাধিকবার ভাঙার ঘটনা ঘটলেও এ বিষয়ে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, বর্তমান এডহক কমিটিতে শিক্ষক প্রতিনিধি মনোনয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের সম্মতি নেওয়ার বিষয়েও অনিয়ম করা হয়েছে। এ ছাড়া অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার কাগজ কেনা, প্রশ্নপত্র সংগ্রহ ও ফটোকপি এবং বিদ্যালয়ের তিনটি জানালায় গ্রিল তৈরির ব্যয় নিয়েও অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ জুন ইউএনও এ.টি.এম. কামরুল ইসলাম চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। একাডেমিক সুপারভাইজার জিনাত রেহানা শারমীনকে আহ্বায়ক এবং উপজেলা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোছাম্মৎ মাহমুদা বেগমকে সদস্যসচিব করা হয়। বিদ্যালয়ের তিন বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে সরেজমিন পরিদর্শনের পর ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়নি। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান জিনাত রেহানা শারমীন বলেন, তদন্তকারী দল চারবার বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের কাজ চলছে। তদন্ত শেষ করে শিগগিরই কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিভাষ কুমার সাহা বলেন, বিদ্যালয়ের সব ধরনের লেনদেন তিনটি ব্যাংকের পাঁচটি হিসাবের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ২০১৮ সালের পর থেকে বিদ্যালয়ের হিসাবের কোনো অডিট হয়নি। তার দাবি, একজনের স্বাক্ষরে কোনো আর্থিক লেনদেন হয় না; ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির সম্মতি এবং তার যৌথ স্বাক্ষরের মাধ্যমে লেনদেন করা হয়।
তবে ২০২৪ সালের হিসাবের কিছু তথ্য দেখতে চাইলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তা দেখাতে পারেননি। বিদ্যালয়ের মেরামত ও উন্নয়নকাজে ঠিকাদার ও মালামাল সরবরাহকারী নিয়োগে দরপত্র বা কোটেশন নেওয়া হয়েছিল কি না, জানতে চাইলেও এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র তিনি তাৎক্ষণিকভাবে দেখাতে পারেননি।
অফিস সহকারী মানস কুমার গুন তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এদিকে বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলাম ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন বলে জানা গেছে। তবে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়কে তার পদত্যাগের বিষয়টি প্রায় ১০ মাস পর, ২৪ ডিসেম্বর জানানো হয়। পদত্যাগের পরও ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য ঘোষণা করে ওই পদের বিপরীতে চাহিদা দেওয়া হয়নি কেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ভাতা বিতরণ রেজিস্টারের রেভিনিউযুক্ত স্বাক্ষরের পাতা ছিঁড়ে ফেলার ঘটনায় বর্তমান এডহক কমিটির সভাপতি কাউছার আহমেদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
তবে কাউছার আহমেদ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি প্রায় তিন মাস ধরে সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। তার সময়ে কোনো অনিয়ম হয়নি। ২০২৪ সালের ভাতা বিতরণ রেজিস্টারের পাতা ছিঁড়ে ফেলার সঙ্গেও তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বিষয়টি যেহেতু তদন্তাধীন, তাই এ মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু বলতে চান না তিনি।
বিদ্যালয়ে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ.টি.এম. কামরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর অভিযোগের সত্যতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাজীপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আল মামুন তালুকদারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।