জামালপুরের মাদারগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা কাশফিয়া জান্নাত কুহু আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে। শিশু অধিকার, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, লিঙ্গসমতা, শিক্ষা ও জলবায়ু সচেতনতা নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছে।
‘শিশুদের নোবেল’ হিসেবে পরিচিত এ পুরস্কারের জন্য চলতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাথমিকভাবে ২৯৮ জনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে মনোনয়ন পেয়েছে ৪২ জন। তাদের একজন কাশফিয়া।
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচুড়া ইউনিয়নের মোমেনাবাদ গ্রামের মেয়ে কাশফিয়া। শিক্ষক দম্পতি কাইয়ুম হিলালী মাইকেল ও শিউলী খাতুনের সন্তান সে। বর্তমানে ঢাকায় পড়াশোনা করলেও নিজের শেকড়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে শিশু অধিকার ও সামাজিক সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছে কাশফিয়া।
কিডস রাইটসের ২০২৬ সালের মনোনয়ন প্রোফাইল অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে বেড়ে ওঠার সময় আশপাশের অনেক মেয়েকে বাল্যবিয়ের শিকার হতে এবং শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে দেখেছে কাশফিয়া। এসব অভিজ্ঞতা তাকে শিশু অধিকার ও লিঙ্গসমতার পক্ষে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে।
গত এক বছরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েকটি বাল্যবিয়ে বন্ধে হস্তক্ষেপের পাশাপাশি স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করেছে সে। উঠান বৈঠক ও স্থানীয় সেমিনারের মাধ্যমে শিশু অধিকার ও লিঙ্গসমতা নিয়েও সচেতনতা তৈরি করছে কাশফিয়া।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজের পাশাপাশি জলবায়ু ন্যায়বিচার ও পরিবেশ সচেতনতা নিয়েও বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে সে। একই সঙ্গে শিশু সাংবাদিক হিসেবেও নিয়মিত কাজ করছে কাশফিয়া।
শিশু সাংবাদিকতায় বিশ্বের প্রথম বাংলা সাইট ‘হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এর সাত শিশু সাংবাদিকের একজন কাশফিয়া। সেখানে প্রকাশিত তার বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক, শিশু অধিকার, সামাজিক বৈষম্য, শিক্ষা ও পরিবেশের বিষয় উঠে এসেছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরে সে।
এবারের আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের প্রাথমিক মনোনয়নে কাশফিয়ার পাশাপাশি ‘হ্যালো’র আরও ছয় শিশু সাংবাদিক রয়েছেন। তারা হলো—অরণ্য আবীর খান প্রাপ্য, ফারাবি জাবিন সায়েরী, জয়া বণিক, সুদীপ্ত দেবনাথ, মুশফিকুর রহমান ও জামিউল হাসান আরাফ। ‘হ্যালো’র সাতজনসহ বাংলাদেশ থেকে মোট ৪২ জনের নাম রয়েছে প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকায়।
এর আগে ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের জন্যও মনোনয়ন পেয়েছিল কাশফিয়া জান্নাত কুহু। সে সময় গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠায় তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
কাশফিয়ার বড় বোন কারিমা ফেরদৌসী কেকাও শিশু অধিকার, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, লিঙ্গসমতা ও জলবায়ু সচেতনতা নিয়ে কাজ করছেন। দুই বোনের সামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনায় এসেছে জামালপুরের মাদারগঞ্জ।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক শিশু অধিকার সংস্থা কিডস রাইটস প্রতিবছর শিশুদের অধিকার ও কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা তরুণদের আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেয়। ২০০৫ সালে চালু হওয়া এ পুরস্কার প্রতিবছর একজনকে দেওয়া হয়। সাধারণত একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী বিজয়ীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
২০২০ সালে বাংলাদেশের নড়াইলের সাদাত রহমান আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন। সাইবার বুলিং থেকে শিশুদের সুরক্ষায় কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এ পুরস্কার পান। সাদাতও একসময় ‘হ্যালো’র শিশু সাংবাদিক ছিলেন।
মাদারগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে এসে কাশফিয়ার আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনায় স্থানীয়ভাবে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তার এই স্বীকৃতি দেশের শিশু অধিকারকর্মী ও তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।