শিরোনাম

জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবার, ইতিহাসে চিরকাল মেসি

জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবার, ইতিহাসে চিরকাল মেসি

মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম সেদিন শুধু কাঁপছিল না—কাঁদছিলও।

৮৫ হাজারের বেশি মানুষের কণ্ঠে একটাই নাম—

‘মেসি... মেসি... মেসি...’

এটা কোনো সাধারণ স্লোগান ছিল না। ছিল দুই দশকের এক ভালোবাসার শেষ উচ্চারণ। জাতীয় দলের জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ। আর গ্যালারিতে থাকা হাজারো মানুষ যেন জানতেন, তারা শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ দেখতে আসেননি—এসেছেন ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের শেষ দৃশ্য দেখতে।

কারও চোখে পানি।
কারও হাতে আর্জেন্টিনার পতাকা।
কারও গায়ে ১০ নম্বর জার্সি।

কারণ একটা প্রজন্মের কাছে আর্জেন্টিনা মানেই মেসি।

২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষে ৬ অক্টোবর ২০২৬, বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ জয়ে জাতীয় দলকে বিদায় জানালেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। বিদায়ী ম্যাচে একটি গোল করেছেন, সঙ্গে করেছেন দুটি অ্যাসিস্ট।

শেষবারের মতো মেসি

ম্যাচের আগেই চোখে পানি ছিল মেসির।

মনুমেন্তালে ঢোকার সময় আবেগ লুকাতে পারেননি। জাতীয় দলের হয়ে দুই দশকের বেশি সময়ের স্মৃতি যেন একসঙ্গে ফিরে আসছিল।

এই সেই দল, যার হয়ে প্রথম ম্যাচ খেলেছিলেন ২০০৫ সালে।
এই সেই জার্সি, যেটি একসময় তাঁর জন্য আনন্দের পাশাপাশি অসহনীয় চাপেরও প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

কত হার!

কত সমালোচনা!

কতবার প্রশ্ন উঠেছে—বার্সেলোনার মেসি কেন আর্জেন্টিনার মেসি হতে পারেন না?

তারপর একদিন সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলেন তিনি।

কোপা আমেরিকা।
ফাইনালিসিমা।
বিশ্বকাপ।

আর শেষ পর্যন্ত এমন এক বিদায়, যা একজন কিংবদন্তির প্রাপ্য।

জাতীয় সংগীতের সময় থেমে গেল কণ্ঠ

মাঠে ঢুকলেন মেসি।

চারপাশে শুধুই তাঁর ছবি, তাঁর নাম, তাঁর ১০ নম্বর।

জাতীয় সংগীত বাজল। মেসি আবেগে নীরব হয়ে রইলেন।

হয়তো মনে পড়ছিল সেই ছোট্ট লিওর কথা—রোজারিওর সেই ছেলেটি, যে শুধু ফুটবল খেলতে চেয়েছিল।

গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি তাঁর শৈশবের স্বপ্নকে কঠিন করে তুলেছিল। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনায় পাড়ি জমাতে হয়েছিল। পরিবার, শহর, পরিচিত পৃথিবী—সবকিছুকে পেছনে ফেলে শুরু হয়েছিল অন্য এক জীবন।

কিন্তু স্বপ্নটা বদলায়নি।

একদিন আর্জেন্টিনার হয়ে খেলবেন।

সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল।

আর ২১ বছর পর সেই স্বপ্নের জার্সি পরেই বিদায় নিলেন তিনি।

শেষ ম্যাচেও মেসি ছিলেন মেসি

বেনিনের বিপক্ষে প্রথমার্ধ গোলশূন্য ছিল।

কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে বদলে গেল সবকিছু।

৪৮ মিনিটে নিকোলাস ওতামেন্দির গোলে অ্যাসিস্ট করলেন মেসি।

৬১ মিনিটে নিকো পাজের গোলেও তাঁর অবদান।

আর ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে নিজেই করলেন গোল।

আর্জেন্টিনা ৩-০ বেনিন।

শেষ ম্যাচে দলের তিন গোলেই সরাসরি অবদান রাখলেন মেসি।

এ যেন বিদায়ের আগে শেষবারের মতো বলে যাওয়া—

‘আমি এখনো আছি।’

আর সেই গোল ছিল আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর ১২৬তম গোল।

২০৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১২৬ গোল—দুটিই আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের রেকর্ড।

একসময় তিনি জাতীয় দল ছাড়তে চেয়েছিলেন

আজকের এই বিদায় দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন—একসময় মেসি নিজেই বলেছিলেন, তিনি আর আর্জেন্টিনার হয়ে খেলবেন না।

২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর হতাশায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

তখন তাঁর ওপর ছিল প্রবল সমালোচনা।

কিন্তু সেই বিদায় স্থায়ী হয়নি।

মেসি ফিরে এলেন।

আর ফেরার পর লিখলেন তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।

২০২১ সালে কোপা আমেরিকা।

২০২২ সালে বিশ্বকাপ।

২০২৪ সালে আরেকটি কোপা আমেরিকা।

এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপেও ৩৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার হয়ে খেললেন তিনি। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর সৃষ্টিশীলতা ও পারফরম্যান্সও ছিল দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অসম্পূর্ণ গল্পটি শেষ পর্যন্ত পূর্ণ হলো

মেসির গল্প একসময় অসম্পূর্ণ মনে হতো।

বিশ্বকাপ নেই।

কোপা আমেরিকা নেই।

ফাইনালের পর ফাইনালে হতাশা।

কিন্তু তিনি থামেননি।

৩৫ বছর বয়সে কাতারে বিশ্বকাপ জিতলেন।

৩৭ বছর বয়সে জিতলেন দ্বিতীয় কোপা আমেরিকা।

আর ৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও আর্জেন্টিনার নেতৃত্ব দিলেন।

যে গল্প একসময় অসম্পূর্ণ থাকার ভয় ছিল, শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে উঠল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম পূর্ণাঙ্গ গল্প।

মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন

একটি প্রজন্ম মেসিকে দেখে বড় হয়েছে।

কেউ বাবার হাত ধরে রাত জেগে তাঁর ম্যাচ দেখেছে।

কেউ স্কুলে যাওয়ার আগে তাঁর গোলের ভিডিও দেখেছে।

কেউ প্রথম ফুটবল হাতে নিয়ে ১০ নম্বর জার্সি পরেছে।

কেউ আবার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনেও মেসির খেলা দেখে কয়েক ঘণ্টার জন্য সবকিছু ভুলে থেকেছে।

তাই মেসির বিদায় শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়।

এটা একটি প্রজন্মের শৈশবেরও বিদায়।

যে প্রজন্মের কাছে ফুটবল মানেই ছিল—

মেসি।

শেষ বাঁশির পর

মনুমেন্তালের গ্যালারি তখনো তাঁকে ছাড়তে চাইছে না।

মেসিও যেন ছাড়তে পারছিলেন না।

একবার এদিকে তাকালেন।

একবার ওদিকে।

হাত নেড়ে অভিবাদন জানালেন।

চোখে পানি।

মুখে হাসি।

হয়তো তিনি জানতেন—এমন রাত জীবনে একবারই আসে।

জাতীয় দলের হয়ে ২১ বছর।

২০৮ ম্যাচ।

১২৬ গোল।

বিশ্বকাপ।

দুটি কোপা আমেরিকা।

আর অগণিত স্মৃতি।

মেসি এবার জাতীয় দলকে বিদায় জানালেন।

কিন্তু কিছু মানুষ বিদায় নিলেও আসলে কোথাও যান না।

তারা থেকে যান গল্পে।

থেকে যান ছবিতে।

থেকে যান রেকর্ডে।

থেকে যান মানুষের স্মৃতিতে।

আর মেসি থেকে যাবেন ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোর একটিতে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর