সাতক্ষীরার পরিচিত আকাশের নিচে একদিন যে মেয়েটি ছোট ছোট স্বপ্ন জমাত, সেই স্বপ্নের পরিধি এখন ছুঁয়েছে আন্তর্জাতিক মঞ্চ। শহরের চেনা পথ, স্কুলের শ্রেণিকক্ষ, বিতর্কের মঞ্চ আর মায়ের হাত ধরে বেড়ে ওঠা সেই মেয়েটিই আজ মিশরের রাজধানী কায়রোতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের নাম উচ্চারণ করছেন গর্বের সঙ্গে। তাঁর হাতে উঠেছে আন্তর্জাতিক সম্মাননার ক্রেস্ট ও সনদ। চারপাশে বিশ্বের নানা দেশের প্রকৌশলী, গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা। আর সেই মুহূর্তে সাতক্ষীরার একটি ঘরে বসে থাকা মায়ের চোখে হয়তো ভেসে উঠেছে মেয়ের শৈশবের অসংখ্য ছবি।
মেয়েটির নাম প্রজ্ঞা পারমিতা রহমান।
প্রজ্ঞার গল্প শুরু হয় কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ঝলমলে মঞ্চ থেকে নয়। শুরু হয়েছিল সাতক্ষীরার একটি পরিবারে, যেখানে মেয়ের স্বপ্নকে ছোট করে দেখার বদলে তাকে আরও বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি বিতর্ক করবে, লিখবে, সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকবে—মেয়ের যে আগ্রহ, তাকে সেখানেই থামিয়ে দেওয়া হয়নি। বরং প্রতিটি আগ্রহকে নিজের মতো করে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন তাঁর মা নাজমুন নাহার।
মা তখন সরকারি কর্মকর্তা। কর্মস্থলের দায়িত্ব, সংসার, নানা ব্যস্ততার মধ্যেও মেয়ের বেড়ে ওঠার প্রতিটি বাঁকে তিনি ছিলেন। কখনো উৎসাহ দিয়েছেন, কখনো পাশে দাঁড়িয়েছেন, কখনো হয়তো শুধু বলেছেন—আরও একটু চেষ্টা করো। সেই ছোট ছোট উৎসাহই ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছে প্রজ্ঞার জীবনে।
আজ সেই মেয়েটিই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। শুধু পাঠ্যবইয়ের গণ্ডিতে আটকে থাকেননি তিনি। বুয়েট অটোমোবাইল ক্লাবের সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। এর আগে বিতর্ক, সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি ও নানা সহশিক্ষা কার্যক্রমে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।

কিন্তু কায়রোর এই সম্মাননা এসেছে আরও কঠিন এক প্রতিযোগিতার পথ পেরিয়ে।
আন্তর্জাতিক প্রকৌশল সংগঠন ASHRAE-এর প্রতিযোগিতার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো শিক্ষার্থী আবেদন করেন। কাগজপত্র যাচাই, একাধিক ধাপের সাক্ষাৎকার—দীর্ঘ বাছাই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত মাত্র তিনজনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। সেই তিনজনের মধ্যে দুজনই বাংলাদেশের বুয়েটের শিক্ষার্থী—প্রজ্ঞা পারমিতা রহমান ও আফতাব। অন্যজন দুবাইয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
তারপর আসে কায়রো যাওয়ার পালা।
১ থেকে ৭ অক্টোবর কায়রোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের সামনে প্রজ্ঞার হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদ। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার সুবাদে তাঁর কায়রো সফরের বিমানভাড়া, ভিসা, থাকা-খাওয়াসহ সব ব্যয় বহন করেছে ASHRAE।
কাগজে-কলমে এটি একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। কিন্তু প্রজ্ঞার পরিবারের কাছে এর অর্থ আরও অনেক বেশি।
মা নাজমুন নাহারের কাছে এটি তাঁর মেয়ের সাফল্যের পাশাপাশি বহু বছরের একটি স্বপ্নেরও পরিণতি। তিনি সাতক্ষীরা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক। সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি মেয়ের বেড়ে ওঠার প্রতিটি পর্যায়ে থেকেছেন সহযাত্রী হয়ে।
মেয়ের অর্জনের কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে যেমন গর্ব, তেমনি আছে গভীর আবেগ। তাঁর ভাষায়, প্রজ্ঞা শুধু তাঁর মেয়ে নন; সে সাতক্ষীরার মেয়ে, বাংলাদেশের মেয়ে। মেয়ের অর্জনের আনন্দ তাই শুধু পরিবারের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে নেই—এ আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো সাতক্ষীরায়।
.jpeg)
প্রজ্ঞার পথচলা অবশ্য একদিনে তৈরি হয়নি।
সাতক্ষীরা কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, এরপর সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পাশাপাশি সাতক্ষীরা জেলায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেন তিনি। এরপর বুয়েটে ভর্তির সুযোগ। প্রতিটি ধাপেই যেন আগের সাফল্যকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার নতুন গল্প।
তবে প্রজ্ঞাকে শুধু ভালো ফলাফলের শিক্ষার্থী হিসেবে দেখলে তাঁর গল্পের বড় অংশই অদেখা থেকে যায়।
বিতর্কের মঞ্চেও তিনি ছিলেন সমান সক্রিয়। সাতক্ষীরা বিতর্ক দলের ক্যাপ্টেন হিসেবে ২০২১ সালের বিভাগীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় দলকে চ্যাম্পিয়ন করেন। একই প্রতিযোগিতায় টানা সাতটি বিতর্কে ‘শ্রেষ্ঠ বক্তা’ নির্বাচিত হন। জাতীয় শিশু পুরস্কারসহ জাতীয় পর্যায়েও পেয়েছেন একাধিক স্বীকৃতি।
সাংবাদিকতার সঙ্গেও ছিল তাঁর সম্পর্ক। চ্যানেল আইয়ের ‘স্বর্ণকিশোরী’ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। খুলনা বিভাগের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বিডিনিউজ২৪ ডটকমের ‘হ্যালো’ বিভাগে শিশু সাংবাদিক হিসেবেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।
অর্থাৎ, প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্নের পাশাপাশি নিজেকে গড়ে তুলেছেন নানা অভিজ্ঞতায়।
হয়তো সেই কারণেই কায়রোর মঞ্চে দাঁড়িয়ে পাওয়া সম্মাননাটির গল্প শুধু একটি প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়ার গল্প হয়ে থাকে না। এটি হয়ে ওঠে একটি মেয়ের নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্প—একটি জেলা শহর থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের জায়গা করে নেওয়ার গল্প।
প্রজ্ঞার বাবা আলহাজ্জ মো. সাহিদুর রহমান সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের খুলনা শাখার ম্যানেজার ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট। পরিবারের শিক্ষা ও কর্মমুখী পরিবেশও প্রজ্ঞার বেড়ে ওঠায় ভূমিকা রেখেছে।
তবে সব অর্জনের পেছনে যে কথাটি বারবার ফিরে আসে, সেটি হলো—স্বপ্ন দেখার সুযোগ।
একটি শিশুকে শুধু ভালো ফল করতে বলা আর তাকে নিজের প্রতিভা খুঁজে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া—দুটির মধ্যে পার্থক্য অনেক। প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছিল তাঁর পরিবার। পড়াশোনার পাশাপাশি বিতর্ক, সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি কিংবা প্রকৌশল—যে জায়গাতেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে, সেখানেই নিজেকে পরীক্ষা করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
আজ কায়রোতে তাঁর হাতে ওঠা সম্মাননা সেই দীর্ঘ যাত্রারই একটি নতুন অধ্যায়।
সাতক্ষীরার মাটিতে বেড়ে ওঠা একটি মেয়ের হাতে যখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্রেস্ট, তখন সেই দৃশ্যের ভেতরে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নেই। আছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একজন মায়ের নিরলস সঙ্গ, শিক্ষকদের অবদান এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখে এগিয়ে চলার গল্প।
নাজমুন নাহারের স্বপ্ন এখন আরও বড়। মেয়ের অর্জন যেন এখানেই থেমে না যায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বল করুক প্রজ্ঞা—একদিন দেশের মানুষের জন্য এমন কিছু করুক, যার সুফল পৌঁছাবে আরও অনেক মানুষের কাছে।
কায়রোর মঞ্চ থেকে সাতক্ষীরার দূরত্ব ভৌগোলিকভাবে অনেক। কিন্তু স্বপ্নের কাছে সেই দূরত্ব যেন খুব বেশি নয়। কারণ সাতক্ষীরার সেই মেয়েটি ইতিমধ্যে দেখিয়ে দিয়েছেন—স্বপ্ন যদি বড় হয়, আর তার সঙ্গে থাকে পরিশ্রম ও সঠিক দিকনির্দেশনা, তাহলে একটি জেলা শহর থেকেও শুরু হতে পারে বিশ্বমঞ্চের যাত্রা।