বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা ও সচেতনতার অভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে উপজেলায় আত্মহত্যায় ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে আহত হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছেন আরও ২৩২ জন। তাঁদের মধ্যে ১২ বছরের কম বয়সী শিশু ১১ জন।
স্থানীয় স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের বয়স ৯ থেকে ৭০ বছর। তাঁদের ৮৭ শতাংশ নারী এবং ৭০ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তবে এসব ঘটনার পেছনের মানসিক সংকট শনাক্ত করা ও পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য উপজেলায় কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী কিংবা প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আত্মহত্যার চেষ্টা করে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও নিয়মিত কাউন্সেলিং প্রয়োজন। তা না হলে তাঁদের মানসিক সংকট অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে এবং পুনরায় সংকটে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদন-সংশ্লিষ্ট তথ্যে বলা হয়েছে, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করে আহত ২৭ জন এবং গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করা দুজন ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকায় পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুজনের মৃত্যু হয়। এ দুজনসহ নয় মাসে উপজেলায় আত্মহত্যায় মোট ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পারিবারিক কলহ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, যৌন নিপীড়ন, বেকারত্ব, আর্থসামাজিক সংকট, মানসিক চাপ ও হতাশাকে আত্মহত্যার ঝুঁকির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, সংকটের সময়ে যথাসময়ে মানসিক সহায়তা না পাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। উপজেলার আটটি ইউনিয়নের মধ্যে বাহিরদিয়া-মানসা, নলধা-মৌভোগ, লখপুর ও ফকিরহাট সদর ইউনিয়নে এ ধরনের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান সাগর বলেন, “আত্মহত্যার চেষ্টার পর হাসপাতালে নিয়ে আসা রোগীদের শারীরিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে কেউ একবার আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে গেলেও তাঁর মধ্যে আবারও এমন প্রবণতা দেখা দিতে পারে। আত্মহত্যা কমাতে পারিবারিক সচেতনতার পাশাপাশি কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, উপজেলায় মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কিংবা প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর না থাকায় রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটি যথাযথভাবে দেখভাল করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ জামান বলেন, “একটি উপজেলায় এত মানুষের আত্মহত্যার প্রবণতা সত্যিই উদ্বেগজনক।” তিনি জানান, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক চাপ ও হতাশা মোকাবিলায় মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, নারী ও শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা এবং চিকিৎসকদের সমন্বয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করা হচ্ছে।
সচেতন মহলের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে উপজেলা পর্যায় থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সচেতনতামূলক সভা-সেমিনার আয়োজন, সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সংকটে থাকা মানুষের জন্য দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।