শিরোনাম
দেবহাটায় শামীম হত্যা

আমিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক মব হামলার অভিযোগ, নিরাপত্তাহীনতায় দেশ ছাড়লেন বীর মুক্তিযোদ্ধা

আমিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক মব হামলার অভিযোগ, নিরাপত্তাহীনতায় দেশ ছাড়লেন বীর মুক্তিযোদ্ধা

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওহিদুজ্জামান শামীম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ফজলুল হক আমিনীর বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক মব হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, এক ইউপি সদস্যের স্বামী ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাঁদের ওপর হামলা, মারধর, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং লুটপাট চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

এসব ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতায় ৭৭ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম স্ত্রীকে নিয়ে ভারতে চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর প্রতিবেশীরা। অন্যদিকে, এক ইউপি সদস্যের স্বামী কুতুব উদ্দীন কাদেরীর বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং স্থানীয় বাসিন্দা সোহাগ হোসেনের বাড়িতে ভাঙচুরের অভিযোগও উঠেছে আমিনী ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে।

গত ১৩ অক্টোবর দেবহাটার বড়শান্তা গ্রামে ওহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আমিনী গ্রেপ্তার হওয়ার পর এসব পুরোনো অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে পৃথক ঘটনাগুলোর অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

পরিত্যক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি

মঙ্গলবার দেবহাটার পারুলিয়া ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া গ্রামে শহিদুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। বাড়ির মূল ফটকে ঝুলছিল তালা। একসময় বীর নিবাস হিসেবে পরিচিত পাকা বাড়িটির চারপাশে এখন লতাপাতা ও ঝোপঝাড়ে ছেয়ে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, নিরাপত্তাহীনতার কারণে বৃদ্ধ বয়সে স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ১৫ মে পারুলিয়া মাছবাজারে প্রকাশ্যে মব হামলার শিকার হন শহিদুল ইসলাম। ইসলাম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তির অভিযোগ তুলে ফজলুল হক আমিনী লোকজন নিয়ে তাঁকে মারধর করেন এবং পরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর একটি পুরোনো মামলায় প্রায় চার মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। পরে পুনরায় হামলার আশঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানিয়েছেন তাঁর প্রতিবেশীরা।

প্রতিবেশী হাফিজুর রহমান বলেন, শহিদুল ইসলাম এলাকায় ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। পরে তাঁকে কারাগারেও থাকতে হয়েছে। এসব ঘটনার পর বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাওয়ায় তাঁর বাড়িটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

শহিদুল ইসলামের যুদ্ধসঙ্গী বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ হাবিবুল বাসার বলেন, ১৯৭১ সালে তাঁরা একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। শহিদুল ইসলামকে তিনি ভালো মানুষ হিসেবেই জানেন। জীবনের শেষ বয়সে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়ে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়েছে—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। স্বাধীন দেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার এমন পরিণতি মেনে নেওয়া কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইউপি সদস্যের স্বামীর বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগ

শুধু শহিদুল ইসলাম নন, দেবহাটার কোমরপুর গ্রামে পারুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য নুরবানু কাদেরীর স্বামী কুতুব উদ্দীন কাদেরীর বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে ফজলুল হক আমিনী ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে।

নুরবানু কাদেরীর অভিযোগ, ২০২৫ সালের ৪ ও ৫ অক্টোবর দুই দফায় তাঁদের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে আপত্তিকর কথা বলার অভিযোগ তুলে এ হামলা চালানো হয়েছিল। তাঁর পানির প্রকল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট এবং দোতলা বাড়িতে ভাঙচুর করা হয়। এতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

নুরবানুর আরও অভিযোগ, হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় প্রতিকার পাওয়ার পরিবর্তে তাঁর স্বামীকে নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। কুতুব উদ্দীন আওয়ামী লীগ-সমর্থক হওয়ায় তাঁকে হয়রানি করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁদের পরিবার এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে জানান নুরবানু।

সোহাগের বাড়িতেও হামলার অভিযোগ

কোমরপুরের ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে দেবহাটার কুলিয়া ইউনিয়নের পুষ্পকাটি গ্রামে আওয়ামী লীগ-সমর্থক সোহাগ হোসেনের বাড়িতেও হামলার অভিযোগ ওঠে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, সোহাগকে ধর্মের শত্রু আখ্যা দিয়ে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে শতাধিক লোক সেখানে জড়ো হন। এ সময় সোহাগকে মারধর এবং তাঁর বাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

সোহাগ হোসেন জানান, ঘটনার পর থেকে তিনি অসুস্থ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে মামলা করার সাহস পাননি বলেও দাবি করেন তিনি।

এলাকায় এখনো আতঙ্কের কথা বলছেন স্থানীয়রা

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পারুলিয়া বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দা জানান, আমিনী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকলেও এলাকায় আতঙ্ক কাটেনি বলে তাঁদের আশঙ্কা। তাঁর মুক্তির দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণাও চলছে বলে তাঁরা জানান।

মঙ্গলবার দিনভর স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে অতীতের একাধিক ঘটনায় আমিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং পূর্ববর্তী মামলাগুলোর নথি যাচাই করা জরুরি।

সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম বলেন, ফজলুল হক আমিনী একটি আলোচিত হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হয়েছেন। শামীম হত্যা মামলায় তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ সুপার জানান। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। এ ঘটনায় আরও দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, আমিনীর বিরুদ্ধে আগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আইনি সহায়তা চাইলে তাঁকে সহায়তা করা হবে। থানায় অভিযোগ দেওয়া হলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শামীম হত্যা মামলা

গত ১৩ অক্টোবর সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার বড়শান্তা গ্রামে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ওহিদুজ্জামান শামীমকে তিন দফায় মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফজলুল হক আমিনী ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করে লোকজন জড়ো করেন এবং রাতে সখিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়ে চিকিৎসাধীন শামীমকে আবারও নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

পরে পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এ ঘটনায় নিহতের ভাই বড়শান্তা গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ আমিনীকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার তথ্যও জানিয়েছে পুলিশ।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বলেন, শামীম হত্যায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে ভিডিও ও ছবি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।

আমিনীর বিরুদ্ধে অতীতের ঘটনাগুলোতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা কী এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য কী—এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেলে ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর