প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন এখন অনেকটাই অচল। স্থলবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তালাবদ্ধ পড়ে আছে আধুনিক এ স্টেশন ভবন, ইমিগ্রেশন-কাস্টমসের অবকাঠামো, ভিআইপি অতিথিশালা, ওভারব্রিজ ও যাত্রীছাউনি। সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত রেলপথের বিভিন্ন অংশও দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে একই চিত্র উঠে এসেছে।
নীলফামারীর সীমান্তবর্তী চিলাহাটির ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ী। ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথ ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৫৬ বছর পর ২০২১ সালের ১ আগস্ট পুনরায় রেল যোগাযোগ চালু হয়। প্রথমে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হলেও পরে ঢাকা-শিলিগুড়ি রুটে ‘মিতালি এক্সপ্রেস’ চালু হয়।
মিতালি এক্সপ্রেসে ভারতগামী যাত্রীদের কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে সম্পন্ন করতে হতো। উত্তরাঞ্চলের মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চিলাহাটিতে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস সুবিধা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন আইকনিক স্টেশন ভবন নির্মাণ করা হয়।
তবে ২০২৫ সালের আগস্টে চিলাহাটি স্থলবন্দর বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের পর চিলাহাটি, দৌলতগঞ্জ ও তেগামুখ স্থলবন্দর বন্ধ এবং বাল্লা স্থলবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। সরকারি ব্যাখ্যায় দীর্ঘদিনের অকার্যকারিতা, পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম না থাকার বিষয়টি উঠে আসে। বর্তমানে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটেও চিলাহাটিকে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বন্ধ হওয়া স্থলবন্দর হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, আইকনিক ভবনের একতলার বারান্দায় সারি সারি ফ্যান পড়ে আছে। দীর্ঘদিন সেগুলো আর চালু হয়নি। জানালা দিয়ে দেখা যায়, কক্ষের ভেতরে প্যাকেটবন্দি চেয়ার-টেবিল ও স্টিলের টুল পড়ে আছে। ধুলায় বিবর্ণ হয়ে গেছে এসব আসবাব। দ্বিতীয় তলায় ব্যাংক ও শুল্ক কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলোও খালি। তৃতীয় তলায় রেস্তোরাঁর জন্য রাখা জায়গাটিও ব্যবহারহীন। ভবনের পাশে থাকা দোতলা ভিআইপি অতিথিশালাও তালাবদ্ধ।
একইভাবে অব্যবহৃত পড়ে আছে ওভারব্রিজ, যাত্রীছাউনি ও গার্ডরুম। সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইনের বিভিন্ন স্থানেও মরিচা পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পণ্য পরিবহন চালু থাকাকালে চিলাহাটিকে ঘিরে শ্রমিক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা ছিল। এতে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। বন্দরকেন্দ্রিক সম্ভাবনা দেখে অনেকে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনাও করেছিলেন। কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনা অনেকটাই থেমে গেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আজিজুল ইসলাম বলেন, চিলাহাটি দিয়ে পণ্য পরিবহনের খরচ অন্যান্য স্থলবন্দরের তুলনায় কম ছিল। এখন বুড়িমারী ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। দূরত্ব বেশি হওয়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।
ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাসুদেব রায় বলেন, মিতালি এক্সপ্রেস চালুর পরও চিলাহাটিতে ইমিগ্রেশন সুবিধা না থাকায় ঢাকায় গিয়ে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের কাজ করতে হতো। পরে চিলাহাটিতে এসব সুবিধা চালুর জন্য আইকনিক ভবন নির্মাণ করা হলেও স্থলবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অবকাঠামোটি কার্যত কাজে আসছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা কাজল ইসলাম বলেন, বন্দর চালু থাকায় এলাকার দরিদ্র মানুষের কিছু কর্মসংস্থান হয়েছিল। কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর অনেকেই কাজ হারিয়েছেন। স্থলবন্দরটি পুনরায় চালু হলে স্থানীয় মানুষের উপকার হবে।
নীলফামারী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মো. আবদুল ওয়াহেদ সরকার বলেন, চিলাহাটি দিয়ে তুলনামূলক কম খরচে পাথর সৈয়দপুর পর্যন্ত আনা যেত। এখন পঞ্চগড় ও লালমনিরহাট হয়ে সড়কপথে পাথর আনতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। তাঁর মতে, বন্দর বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও সরকার—সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শুধু আইকনিক স্টেশন ভবন নির্মাণেই নয়, চিলাহাটি ও চিলাহাটি বর্ডার রেলপথ নির্মাণেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের চিলাহাটি ও চিলাহাটি বর্ডার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মো. আবদুর রহিম জানান, রেলপথ নির্মাণে প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮০ কোটি টাকা। পরে তা বেড়ে ১২৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। রেলের ওয়াগন, সড়ক, বিদ্যুৎসহ আনুষঙ্গিক খাত মিলিয়ে মোট ব্যয় প্রায় ২০০ কোটি টাকা বলে জানান তিনি।
স্থলবন্দর বন্ধের প্রভাব পড়েছে রেলওয়ের রাজস্বেও। চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পাথরবাহী একেকটি ট্রেনের চালান থেকে পাথরের পরিমাণ অনুযায়ী রেলওয়ে ২০ থেকে ২৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া পেত। মাসে চার-পাঁচটি মালবাহী ট্রেন চলাচল করায় মাসিক আয় ছিল প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা।
চিলাহাটি স্টেশনের সহকারী মাস্টার ইসমাইল হোসেন বলেন, ২০২১ সাল থেকে ভারত থেকে মূলত পাথরবোঝাই ট্রেন আসত। মাসে চার-পাঁচটি মালবাহী ট্রেন চলাচল করত। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রেলওয়ের প্রায় ১৩ কোটি টাকা আয় হয়েছে। পরে পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী—দুই ধরনের ট্রেন চলাচলই বন্ধ হয়ে যায় বলে জানান তিনি।
নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, চিলাহাটি স্থলবন্দরের সম্ভাবনার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এটি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। ভবিষ্যতে বন্দরটি আবার চালু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের দাবি, চিলাহাটি স্থলবন্দর পুনরায় চালু হলে শুধু নীলফামারী নয়, পুরো উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরতে পারে। একই সঙ্গে ভারতসহ নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাও কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।