শিরোনাম

লন্ডনের জীবন ছেড়ে জন্মভূমিতে, জনকল্যাণে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় চিকিৎসকের

লন্ডনের জীবন ছেড়ে জন্মভূমিতে, জনকল্যাণে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় চিকিৎসকের

দীর্ঘ প্রবাসজীবন, লন্ডনে পরিবার ও প্রতিষ্ঠিত কর্মজীবন—সবকিছুর বাইরে এসে জন্মভূমির মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন চিকিৎসক ডা. মোহাম্মেদ ওসমান গণি সরদার। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার মনইল-কানুপুর গ্রামের এই চিকিৎসক নিজের উপার্জিত অর্থ ব্যয় করছেন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে। তাঁর বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানা গেছে।

তাঁর উদ্যোগে এলাকায় গড়ে উঠেছে হাসপাতাল ও পলিক্লিনিক, মসজিদ, কবরস্থান, ঈদগাহ, কমিউনিটি সেন্টার ও পাঠাগার। শিক্ষার্থীদের জন্য বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থাও করেছেন তিনি। আক্কেলপুর শহরে প্রতিষ্ঠা করেছেন ক্লাব ও লাইব্রেরি। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে নিজ এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন এই চিকিৎসক।

কৃষক পরিবার থেকে লন্ডনে চিকিৎসক

মনইল-কানুপুর গ্রামের একটি সাধারণ কৃষক পরিবারে ছয় ভাই-বোনের মধ্যে বেড়ে ওঠেন ওসমান গণি। শৈশব থেকেই মেধাবী এই শিক্ষার্থী চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি লাহোর, প্রাগ ও লন্ডনে যান।

১৯৫৭ সালে তাঁর চিকিৎসাজীবনের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে (এনএইচএস) দীর্ঘদিন চিকিৎসাসেবা দেন তিনি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তাঁর কর্মজীবনের বিস্তৃতি ছিল।

দীর্ঘ প্রবাসজীবনে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে লন্ডনে সংসার গড়েছিলেন ওসমান গণি। তবে জন্মভূমির প্রতি টান কখনো কমেনি। গ্রামের স্মৃতি, বাবা-মায়ের কবর এবং শৈশবের পরিচিত পরিবেশ তাঁকে বারবার আকৃষ্ট করত। একপর্যায়ে লন্ডনের জীবন ছেড়ে তিনি ফিরে আসেন নিজের গ্রামে। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানেরা লন্ডনেই থেকে যান। বর্তমানে গ্রামের বাড়িতে দুই সহকারীকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি।

নিজের উপার্জনে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার প্রসার

জন্মভূমিতে ফিরে ওসমান গণি নিজের উপার্জিত অর্থ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে শুরু করেন। স্থানীয় মানুষের চিকিৎসাসেবার সুযোগ বাড়াতে প্রতিষ্ঠা করেন পলিক্লিনিক। শিক্ষার প্রসারে স্কুলে বিজ্ঞান ভবন ও পাঠাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেন। আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহায়তার জন্য চালু করেন শিক্ষাবৃত্তি।

গ্রামের মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সুবিধার্থে মসজিদ, কবরস্থান, ঈদগাহ, পুকুরঘাট ও কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণেও অর্থ ব্যয় করেছেন তিনি। পাশাপাশি আক্কেলপুর শহরে গড়ে তুলেছেন ক্লাব ও লাইব্রেরি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তাঁর উদ্যোগে গ্রামের একটি বড় মসজিদের নির্মাণকাজ চলছে। মসজিদটি নির্মাণে প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের অর্থও তিনি নিজের উপার্জন থেকে দিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট বর্ণনায় বলা হয়েছে।

সব মিলিয়ে চিকিৎসা, শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামোসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে তাঁর ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা বলে জানা গেছে। তবে প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের হিসাব ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা হলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা পাওয়া যাবে।

বার্ধক্যেও মানুষের পাশে

বয়সের ভারে বর্তমানে আগের মতো নিয়মিত ক্লিনিকে বসতে পারেন না ওসমান গণি। তবু তাঁর কাছে সাহায্য কিংবা চিকিৎসা-পরামর্শের জন্য আসা মানুষকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ কেনার অর্থও দেন বলে জানা গেছে।

দীর্ঘদিন চিকিৎসাসেবায় যুক্ত থাকার পরও মানুষের পাশে থাকার এ প্রচেষ্টা তাঁর জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষের চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করে তিনি নিজ এলাকায় একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছেন।

প্রবাসের অর্জন জন্মভূমির মানুষের জন্য

ডা. মোহাম্মেদ ওসমান গণি সরদারের জীবনপথে রয়েছে চিকিৎসাশিক্ষা, দীর্ঘ প্রবাসজীবন এবং জন্মভূমিতে ফিরে জনকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় মানুষের কতটা উপকারে আসছে, নিয়মিত কতজন সেবা পাচ্ছেন এবং কীভাবে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে—তা সরেজমিন অনুসন্ধানের মাধ্যমে আরও স্পষ্টভাবে জানা সম্ভব।

ব্যক্তিগত উপার্জনকে নিজ এলাকার মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার এই উদ্যোগ আক্কেলপুরের মনইল-কানুপুর গ্রামে তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তাঁর কর্মকাণ্ড প্রবাসে অর্জিত সম্পদ ও অভিজ্ঞতাকে জন্মভূমির উন্নয়নে কাজে লাগানোর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

 

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর