স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের জনপদের শান্ত, নিবিড় এক গ্রামে কৃষিনির্ভর সচ্ছল মুসলিম পরিবারে আমার শৈশব কেটেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেষ দিকে পাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দল বেঁধে গ্রামের মেঠোপথ ধরে স্কুলে যাতায়াত করতাম।
তখন খুব বেশি কিছু বোঝার বয়স হয়নি। তবে চারপাশের পরিবেশে একধরনের অস্বস্তি, শঙ্কা ও আতঙ্ক অনুভব করতাম। সন্ধ্যার পর গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি প্রায়ই আমাদের বাড়ির বৈঠকখানায় আসতেন। তাঁরা কী নিয়ে আলোচনা করতেন, তা বুঝতাম না। তবে তাঁদের চোখেমুখে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার ছাপ স্পষ্ট দেখতে পেতাম।
বাবা কাজের প্রয়োজনে শহরে গেলে অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে একটি খবরের কাগজও নিয়ে ফিরতেন। কৌতূহলী মনে সেই পত্রিকার পাতায় চোখ বোলাতাম।
১৯৭৫ সালের শেষ দিকে হঠাৎ একদিন পাড়ার সেই প্রবীণ ব্যক্তিদের আলোচনায় আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস লক্ষ করলাম। পরদিন দ্বিপ্রহরের দিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে বাবা সন্ধ্যায় শহর থেকে ফিরলেন। তাঁর হাতে যথারীতি একটি খবরের কাগজ। পত্রিকার প্রথম পাতায় সেনাবাহিনীর পোশাক পরা একজন ব্যক্তিকে ঘিরে সিপাহী-জনতার উচ্ছ্বাসের ছবি। সেই ছবির ব্যক্তিটির প্রতি আমার কৌতূহল তৈরি হয়। ছবিটি আমার মানসপটে এমনভাবে গেঁথে যায়, যা আজও অমলিন।
পরবর্তী সময়ে বয়স ও জ্ঞানের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জানতে পেরেছি সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ, তার ঐতিহাসিক পটভূমি এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ছিল স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়। নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাওয়া রাষ্ট্রে সেদিন সংঘটিত সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এদিন সেনাবাহিনীর তৎকালীন বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। স্বাধীনতার ঘোষক ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নেয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তারকারী এই দিনটি পরবর্তী সময়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংকটের সময়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব দেশের রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল।
এই দিবসের মূল তাৎপর্য হচ্ছে জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থে সম্মিলিত দায়িত্ববোধের চেতনা। ঐতিহাসিক এই দিনের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জাতীয় জীবনের সংকটময় মুহূর্তে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় জনগণের ঐক্য ও সম্মিলিত ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সম্মুখসারির যোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার। স্বাধীনতার পর তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং জাতীয় উৎপাদন ও উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়গুলো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রার জন্য শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা। মত ও পথের ভিন্নতা থাকলেও জাতীয় স্বার্থে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। অতীতের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বিভেদ ও প্রতিহিংসা পরিহার করে একটি শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের অঙ্গীকার।
বর্তমান সময়ে দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, কৃষি ও শিল্পের বিকাশ এবং সাধারণ মানুষের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন সাধনে সরকারের গৃহীত উদ্যোগগুলো সফল করতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ এবং একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
একই সঙ্গে বিগত প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে ক্ষতিগ্রস্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করা, মানুষের ভোটাধিকার ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। কারণ, গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে জনগণের অধিকার, স্বাধীন মতপ্রকাশ, সুশাসন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণের মধ্যে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করি, দেশের নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয় ও পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। নদীভাঙন রোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও জনজীবনে পানির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং দেশের মানুষের জীবন-জীবিকার সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের মানুষের উন্নয়ন, কৃষি ও যোগাযোগব্যবস্থার অগ্রগতি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নেও আমাদের বিশেষ মনোযোগ রয়েছে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
৭ নভেম্বরের চেতনা ধারণ করে আমাদের প্রত্যাশা—জাতীয় ঐক্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতির ভিত্তিতে একটি বৈষম্যহীন, মানবিক, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতীয় ঐক্যের আহ্বান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে দেশ ও জনগণের কল্যাণে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের এই তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তে শৈশবে দেখা সংবাদপত্রের পাতার সেই অমলিন ছবিটি বারবার আমার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে। সময়ের পরিক্রমায় সেই ছবির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস ও চেতনা আমার রাজনৈতিক পথচলায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। জনগণের কল্যাণে কাজ করা, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশ ও জাতির উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত রাখার ক্ষেত্রে সেই স্মৃতি আজও আমার জন্য অনন্য প্রেরণা।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে দেশবাসী, পঞ্চগড় জেলার সর্বস্তরের জনগণ এবং বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
আসুন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সব ভেদাভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ, উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার সম্মিলিত অঙ্গীকার করি।