শিরোনাম
ছেলের হাতে বাবার স্বপ্ন

১০ হাজার টাকায় গড়ে উঠল প্রতিষ্ঠান

১০ হাজার টাকায় গড়ে উঠল প্রতিষ্ঠান

পুঁজি ছিল মাত্র ১০ হাজার টাকা। সঙ্গে ছিল দুটি পুরোনো ও অকেজো সেলাই মেশিন। ছিল বাবার রেখে যাওয়া একটি স্বপ্ন। সেই সামান্য সম্বল নিয়েই শুরু। তিন বছরের ব্যবধানে সেই উদ্যোগ এখন ৩১টি সেলাই মেশিনের কর্মচঞ্চল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কর্মসংস্থান হয়েছে ৩২ জনের। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছে অর্ডার; তৈরি ডেকোরেশন সামগ্রী পৌঁছে যাচ্ছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত।

এই গল্প ডিমলার তরুণ উদ্যোক্তা ফজিদুল ইসলামের। তবে ব্যবসা শুরুর গল্পের চেয়েও তাঁর কাছে বড় হয়ে আছে প্রয়াত বাবা মাইক জহুরুল ইসলামের স্বপ্ন পূরণের বিষয়টি।

জহুরুল ইসলাম স্বপ্ন দেখতেন, উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী ডিমলায় একটি মাল্টিমিডিয়া ডিজাইন সেন্টার গড়ে তুলবেন। কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। বাবার মুখে বারবার শোনা সেই স্বপ্ন ছেলের মনে গেঁথে যায়। বাবার মৃত্যুর এক বছর পর, ২০২৩ সালের ২৫ জুলাই, মাত্র ১০ হাজার টাকা নিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন ফজিদুল।

ডিমলা সদর ইউনিয়নের ডিমলা আর বি আর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণে হাইস্কুলপাড়া এলাকায় পৈতৃক জায়গায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফারিহা ডিজাইন সেন্টার’। শুরুতে দুটি পুরোনো ও অকেজো সেলাই মেশিন কিনে মেরামত করেন। শহিদুল ইসলামের পরামর্শ ও উৎসাহে দুজন অপারেটরকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় ডেকোরেশন সামগ্রী তৈরির কাজ।

শুরুতে কাজের পরিধি ছিল সীমিত। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই অর্ডার বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে উৎপাদনও। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য পরে দুটি বেসরকারি এনজিও থেকে মোট ১৪ লাখ টাকা ঋণ নেন ফজিদুল। মাসিক কিস্তিতে সেই ঋণ পরিশোধ করে যাচ্ছেন তিনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, পৈতৃক জায়গায় গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটিতে এখন ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। সারি সারি সেলাই মেশিনে চলছে কাজ। কেউ কাপড় কাটছেন, কেউ ক্রেতার দেওয়া নকশা অনুযায়ী সেলাই করছেন। অন্যরা তৈরি পণ্য গুছিয়ে রাখছেন। পরে এসব পণ্য কুরিয়ারযোগে পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রেতাদের কাছে।

ফজিদুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে ৩১টি সেলাই মেশিন রয়েছে। কাজ করছেন ২৫ জন অপারেটর ও সাতজন কর্মচারী। মাসে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ডেকোরেশন সামগ্রী উৎপাদন করা হয়। উৎপাদিত পণ্যের প্রায় পুরোটাই একই মাসে বিক্রি হয়ে যায়।

কাঁচামাল, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও ঋণের কিস্তিসহ বিভিন্ন খরচ বাদ দিয়ে মাস শেষে তাঁর নিট লাভ থাকে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা।

ডিমলার মতো উপজেলা শহরে বসে দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ‘FARIHA DESIGN CENTER’ নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পণ্যের প্রচার করা হয়। পাশাপাশি ‘ফারিহা ডিজাইন সেন্টার ডিমলা’ নামে ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তুলে ধরা হচ্ছে। অনলাইনে অর্ডার পাওয়ার পর ক্রেতার চাহিদা ও নির্ধারিত নকশা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করে কুরিয়ারে পাঠানো হয়।

ফজিদুল ইসলাম বলেন, “বাবার স্বপ্ন ছিল ডিমলায় একটি ডিজাইন সেন্টার গড়ে তোলা। তিনি সেটি করে যেতে পারেননি। বাবার সেই স্বপ্নই আমি নিজের স্বপ্ন হিসেবে নিয়েছি। অল্প পুঁজি দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চাই।”

তিনি বলেন, ব্যবসা আরও সম্প্রসারণে মূলধন প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা থেকে সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা পাওয়া গেলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আরও মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, “স্থানীয় তরুণদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। ফজিদুল ইসলামের মতো উদ্যোক্তারা নিজেদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদের কাজের সুযোগ তৈরি করছেন। এ ধরনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় উদ্যোক্তাদের সহায়তার সুযোগ থাকলে নিয়ম অনুযায়ী তা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।”

মাত্র ১০ হাজার টাকা আর দুটি অকেজো সেলাই মেশিন দিয়ে যে উদ্যোগের শুরু, তিন বছরে সেটিই হয়ে উঠেছে ৩১টি মেশিনের একটি কর্মচঞ্চল প্রতিষ্ঠান। সেখানে কাজ করছেন ৩২ জন। বাবার স্বপ্ন হয়তো হুবহু সেই রূপে বাস্তবায়িত হয়নি, কিন্তু ফজিদুল ইসলামের হাত ধরে ডিমলার মাটিতে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের একটি নতুন ঠিকানা। আর সেই পথচলার শুরু হয়েছিল খুব সামান্য পুঁজি আর একটি স্বপ্নকে সঙ্গী করে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর