বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিচালক এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিনকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবি, আটটি দরপত্র বাতিল এবং একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারী ঠিকাদারের দাবি, অনৈতিক আর্থিক সুবিধা দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এফ.ডি. ইন্টারন্যাশনাল নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. সাগর আহমেদ আকিব এসব অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, বিআইডব্লিউটিএর আহ্বান করা আটটি ই-জিপি দরপত্রে অংশ নিয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু দরপত্রের শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো বাতিল করা হয়। পরে তাঁর প্রতিষ্ঠানকে দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আকিবের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট ২০২৬ পরিচালক এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিন তাঁকে নিজের দপ্তরে ডেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। তিনি ওই অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পরদিন, ২০ আগস্ট, তাঁর প্রতিষ্ঠানের অংশ নেওয়া আটটি দরপত্র বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয় বলে দাবি তাঁর।
অভিযোগকারীর দাবি, দরপত্র বাতিলের পেছনে গ্রহণযোগ্য কারিগরি বা আইনগত কারণ তাঁকে জানানো হয়নি। তাঁর অভিযোগ, আর্থিক সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের মূল্যায়ন প্রতিবেদন, বাতিলের আদেশ ও অন্যান্য প্রমাণপত্র পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আট দরপত্র বাতিল, কালো তালিকাভুক্তির অভিযোগ
এফ.ডি. ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী সাগর আহমেদ আকিবের দাবি, তাঁর প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিএর আটটি ই-জিপি দরপত্রে অংশ নেয় এবং সেগুলোর মধ্যে একাধিক দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দরপত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে টেন্ডার আইডি 1304079, 1304074, 1303660, 1303530, 1303517, 1303503 ও 1303532-সহ আরও একটি দরপত্র।
আকিবের অভিযোগ, দরপত্র বাতিলের পর কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ না দিয়েই তাঁর প্রতিষ্ঠানকে দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। এতে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করার সুনির্দিষ্ট আদেশ, এর পেছনে উল্লেখ করা কারণ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে আটটি দরপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ কী ছিল, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। দরপত্রের শর্ত, কারিগরি যোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রযোজ্য ক্রয়বিধি অনুসারে মূল্যায়নের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। ফলে এ ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের পূর্ণাঙ্গ নথি পরীক্ষা করা জরুরি।
স্পিডি গ্রুপকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ
দরপত্র প্রক্রিয়ায় ‘স্পিডি গ্রুপ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেছেন সাগর আহমেদ আকিব। তাঁর দাবি, নিজের প্রতিষ্ঠানের দরপত্র বাতিলের ঘটনাগুলোর সঙ্গে এ প্রক্রিয়ার যোগসূত্র রয়েছে।
তবে স্পিডি গ্রুপকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন নথি, তুলনামূলক দরপত্র বিবরণী কিংবা সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটি কোনো অনিয়মের মাধ্যমে কাজ পেয়েছে বা পাওয়ার চেষ্টা করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে স্পিডি গ্রুপের অংশ নেওয়া দরপত্র, প্রতিষ্ঠানটির যোগ্যতা, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বরখাস্তের পর কীভাবে ফিরলেন গুরুত্বপূর্ণ পদে?
অভিযোগকারী ঠিকাদার এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিনের পূর্ববর্তী সাময়িক বরখাস্তের ঘটনাও সামনে এনেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনার পর ওই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০’-এর ৩৫(খ) ও ৩৫(ঙ) বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রবিধানমালার ৪১(১) বিধি অনুযায়ী চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরে বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, বরখাস্ত থাকাকালে ওই কর্মকর্তাকে নিয়মিত দাপ্তরিক দায়িত্ব না দিয়ে প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগে হাজিরা দেওয়ার শর্তে খোরাকি ভাতা দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি চাকরিতে পুনর্বহাল হন এবং পরিচালক (ক্রয় ও সংরক্ষণ) পদে দায়িত্ব পান।
তবে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার, পুনর্বহাল এবং নতুন দায়িত্বে পদায়নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আদেশ ও পূর্ণাঙ্গ নথি এ প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। ফলে পুনর্বহালের প্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
এফ.ডি. ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী সাগর আহমেদ আকিব অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত দাবি করেছেন।
তাঁর অভিযোগ, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিষয়ে কার্যকর তদন্ত না হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তিনি সংশ্লিষ্ট দরপত্র বাতিল, কালো তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত এবং কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
বিআইডব্লিউটিএর মতো সরকারি সংস্থায় ক্রয় ও সংরক্ষণ বিভাগের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিভাগের দরপত্র ব্যবস্থাপনা নিয়ে ঘুষ দাবি, অনিয়ম কিংবা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগের বিষয়ে পরিচালক এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিন, বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান, পরিচালক (প্রশাসন) এস. এম. শাহেদ রেজা, সংশ্লিষ্ট ক্রয় কর্মকর্তারা এবং স্পিডি গ্রুপের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।