শিরোনাম
আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের নামে ওমেগা-৩, ‘লাগেজে’ আসার দাবি রিকরমন-৫০০০; QR কোডেও মিলছে না তথ্য—সরবরাহকারী নাইম কোথায়?

গুলশানের অভিজাত ফার্মেসিতে ‘নকল’ ও অননুমোদিত ওষুধের কারবার?

গুলশানের অভিজাত ফার্মেসিতে ‘নকল’ ও অননুমোদিত ওষুধের কারবার?

জীবন বাঁচানোর ওষুধই যদি হয় জীবনঝুঁকির কারণ—তাহলে দায় নেবে কে?

রাজধানীর অভিজাত গুলশান এলাকার নামী-দামি ফার্মেসিতে বিক্রি হওয়া কিছু ওষুধ ও স্বাস্থ্যপণ্যের উৎস, অনুমোদন, আমদানি প্রক্রিয়া ও মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে বিশেষ করে ওমেগা-৩ ফিশ অয়েল ক্যাপসুল এবং কিডনি রোগীদের ব্যবহৃত ‘রিকরমন-৫০০০’ ইনজেকশন নিয়ে মিলেছে একাধিক অসঙ্গতির তথ্য।

অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের পণ্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে ওমেগা -৩ ক্রেতাদের কাছে উচ্চ দামে বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ কিছু পণ্যের লেবেল, QR কোড, আমদানিকারকের তথ্য ও সরবরাহের উৎস নিয়ে স্পষ্টতা নেই।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়—কিছু বিক্রেতার ভাষ্য অনুযায়ী, কম দামের ‘রিকরমন-৫০০০’ নাকি ‘লাগেজে করে’ দেশে আসে।

QR কোড আছে, তথ্য নেই!

অনুসন্ধানে গুলশানের কয়েকটি ফার্মেসিতে বিক্রি হওয়া কিছু ওমেগা-৩ ক্যাপসুলের প্যাকেট হাতে নিয়ে দেখা যায়, আকর্ষণীয় মোড়ক ও লেবেল ব্যবহার করা হয়েছে। পণ্যের লেবেলে রয়েছে QR কোড।

কিন্তু QR কোড স্ক্যান করে পণ্যের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, পণ্যের সত্যতা বা নির্ভরযোগ্য উৎসের প্রত্যাশিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানে দেখা গেছে।

প্রশ্ন উঠছে—QR কোড যদি পণ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্যই হয়, তাহলে সেটি স্ক্যান করে তথ্য মিলছে না কেন?

এটি নিম্নমানের লেবেলিং, নাকি পণ্যের উৎস গোপন করার কোনো কৌশল—তা যাচাই করা প্রয়োজন।

২ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার—একই ইনজেকশনের এত দাম কেন?

কিডনি রোগীদের হিমোগ্লোবিন কমে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শে নির্দিষ্ট ধরনের ইনজেকশন ব্যবহৃত হয়। অনুসন্ধানে গুলশানের কয়েকটি ফার্মেসিতে ‘রিকরমন-৫০০০’ ইনজেকশন প্রায় ২ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।

একই নামে বাজারজাত পণ্যের দামে এত বড় পার্থক্যের কারণ জানতে চাইলে ফার্মেসিগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, কম দামের পণ্য ‘লাগেজে করে আসে’।

যদি সত্যিই লাগেজে করে কোনো ওষুধ দেশে আসে, তাহলে প্রশ্ন—কে আনছে? কোথা থেকে আনছে? কার মাধ্যমে আনছে? কোন পথে বাজারে ঢুকছে? আর কোন ফার্মেসি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রোগীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে?

‘ক্রেতারা চায়, তাই বিক্রি করি’

গুলশানের তামান্না, লাজফার্মা,গুলশান ফার্মা, ইসলামিয়া,বরিশাল ফার্মেসিসহ প্রায় সকল ফার্মোসিতেই এসব ওষধ বিক্রি করছে। তামান্নারঢ় বিক্রয়কর্মী সাজুর কাছে এসব পণ্য বিক্রির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘ক্রেতারা চায়, তাই বিক্রি করি।’

কিন্তু জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রে শুধু ‘ক্রেতা চায়’—এই যুক্তি কি যথেষ্ট?

বিশেষ করে কোনো পণ্যের বৈধ আমদানি, নিবন্ধন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ নিয়ে প্রশ্ন থাকলে ফার্মেসির বিক্রেতার দায় কোথায়—সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।

সরবরাহকারী ‘নাইম’, কিন্তু তার কোম্পানি অজানা

এসব পণ্য কোথা থেকে আসে—জানতে চাইলে তামান্না ফার্মেসির বিক্রয়কর্মী সাজু ‘নাইম’ নামে এক ব্যক্তির কথা বলেন।

পরে ওই ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি ছোট চাকরি করেন। তার কোম্পানির নাম প্রকাশ করলে চাকরি চলে যেতে পারে বলেও জানান তিনি।

কে এই নাইম? কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তিনি? তার প্রতিষ্ঠান কী ধরনের ওষুধ বা স্বাস্থ্যপণ্য সরবরাহ করে? বৈধ আমদানি নথি আছে কি না? আর তার কাছ থেকে কারা এসব পণ্য নেয়?

নাইমের বক্তব্য ও সরবরাহের নথি যাচাই করা গেলে কথিত সরবরাহচক্র সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।

চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনেও ‘রিকরমন-৫০০০’

অনুসন্ধানে চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনের বিষয়টিও উঠে এসেছে।

রোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক এম এ সামাদ এবং ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের চিকিৎসক ডা. আরিফ আনোয়ারের প্রেসক্রিপশনে ‘রিকরমন-৫০০০’ ব্যবহারের তথ্য রয়েছে।

তবে কোনো চিকিৎসক কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড প্রেসক্রাইব করেছেন—এটি নিজে থেকে ওষুধটির নকল বা অননুমোদিত হওয়ার প্রমাণ নয়। বরং প্রশ্ন হলো, প্রেসক্রাইব করা পণ্যটি বৈধ উৎসের কি না এবং রোগীর হাতে যে পণ্য যাচ্ছে সেটি প্রেসক্রিপশনের একই মান ও উৎসের কি না।

হিমোগ্লোবিন না বাড়ায় বদলে গেল ওষুধ

এক রোগীর ক্ষেত্রে ‘রিকরমন-৫০০০’ ব্যবহারের পরও প্রত্যাশিতভাবে হিমোগ্লোবিন না বাড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পরে ওই রোগী ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে নেফ্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক সারওয়ার ইকবালের পরামর্শ নেন। রোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, 

তিনি ‘রিকরমন’ বাদ দিয়ে ‘মিরসেরা ১০০’ প্রেসক্রাইব করেন।

এ ছাড়া কন্টিনেন্টাল হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক সুফী মোহাম্মাদ সুহাইল ‘রিকরমন' বাদ দিয়ে মিরসেরা প্রেসকাইভ করেন।

অভিযোগের বিষয়ে প্রথমে গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আসলে এসব বিষয়ে আমাদের কাজ করার এখতিয়ার নেই। তবে ভোক্তা অধিকার বা সরকারের অন্য কোনো অর্গান যদি আমাদের ডাকে, তাহলে আমরা কেবল তাদের নিরাপত্তা বিধান করি।’

অর্থাৎ, ওষুধের বৈধতা বা বাজারজাতকরণের বিষয়টি পুলিশের সরাসরি তদন্তের আওতায় না থাকলেও কোনো অভিযান বা সরকারি সংস্থার কার্যক্রমে আইনশৃঙ্খলা সহায়তার প্রয়োজন হলে পুলিশ সহযোগিতা করতে পারে।

‘অভিযোগ পেলে দেখব’—ভোক্তা অধিকার

বিষয়টি নিয়ে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখি। তবে আমরা এ বিষয়টা দেখব।’

তবে এখন প্রশ্ন হলো—শুধু অভিযোগের অপেক্ষায় থাকবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, নাকি জীবনরক্ষাকারী ওষুধের বৈধতা নিয়ে ওঠা গুরুতর প্রশ্নের ভিত্তিতে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হবে?

নকল নাকি অননুমোদিত—জবাব দেবে ল্যাব

পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এখানেই। কোনো ওষুধ নকল, নিম্নমানের কিংবা অননুমোদিত কি না—সেটি চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নথি যাচাই ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা।

সংশ্লিষ্ট পণ্যের ব্যাচ নম্বর, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক, নিবন্ধন, আমদানি অনুমোদন, ইনভয়েস, চালান, সংরক্ষণব্যবস্থা ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নথি যাচাই করা জরুরি।

বিশেষ করে ‘লাগেজে করে’ ওষুধ আসার দাবি সত্য হলে এর সঙ্গে জড়িত পুরো সরবরাহচক্র খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

কারণ প্রশ্নটি শুধু একটি ফার্মেসি বা একটি ইনজেকশনকে ঘিরে নয়।

প্রশ্নটি আরও বড়—

  • রোগীর জীবন রক্ষার নামে দেশের ওষুধের বাজারে কি কোনো অননুমোদিত সরবরাহচক্র সক্রিয়?
  • যদি থাকে, সেই চক্রের পেছনে কারা?
  • তামান্না ফার্মেসির সাজুর কথিত সরবরাহকারী নাইমই কি সেই চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কড়ি? নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কোনো নেটওয়ার্ক?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের তদন্ত, সংশ্লিষ্ট ফার্মেসিতে অভিযান, পণ্যের নমুনা সংগ্রহ এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষা।

কারণ জীবনরক্ষাকারী ওষুধের বাজারে ‘লাগেজ’, ‘চাহিদা’ আর অজানা সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর করে কোনো পণ্য রোগীর হাতে পৌঁছানো কতটা নিরাপদ—সেই প্রশ্নের উত্তর এখন কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর