বিশ্বজুড়ে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আধিপত্যের মধ্যে দেশীয় প্রযুক্তিতে নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে রংপুরের ‘ফ্রিডার’। উদ্যোক্তাদের দাবি, যাত্রা শুরুর পাঁচ মাসের মধ্যে প্ল্যাটফর্মটিতে নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। ব্যবহারকারীর এই সংখ্যা দেশীয় উদ্যোগটির জন্য সম্ভাবনা তৈরি করলেও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, তথ্যের নিরাপত্তা, সেবার মান ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘স্বাধীনতা উপভোগ করুন ফ্রিডারের মধ্যে’ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্ল্যাটফর্মটির লক্ষ্য, বাংলাদেশের মানুষের জন্য এমন একটি ডিজিটাল পরিসর তৈরি করা, যেখানে তাঁরা নিজেদের গল্প, সংবাদ, মতামত ও সৃজনশীলতা তুলে ধরতে পারবেন। একই সঙ্গে দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরির কথাও বলছেন উদ্যোক্তারা।
ফ্রিডারের উদ্যোক্তা মো. আখতারুজ্জামান জানান, চলতি বছরের ৭ মে প্ল্যাটফর্মটির যাত্রা শুরু হয়। পাঁচ মাসের মধ্যে দেশ-বিদেশের ব্যবহারকারীদের মধ্যে এটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর পরিচিতি আরও বেড়েছে। তাঁর দাবি, বর্তমানে নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি এবং প্রতিদিন নতুন করে প্রায় এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার ব্যবহারকারী নিবন্ধন করছেন।

তবে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও সার্ভারের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে। উদ্যোক্তাদের মতে, ব্যবহারকারীদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে নিয়মিত প্রযুক্তি উন্নয়ন, পর্যাপ্ত সার্ভার সক্ষমতা এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা ও সেবার মান বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রিডারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, অশ্লীল কনটেন্ট পরিহার এবং দেশের সম্মান ও মূল্যবোধ বজায় রেখে ইতিবাচক ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া মনিটাইজেশনের মাধ্যমে আয় করা ব্যবহারকারীদের প্রাপ্য লভ্যাংশ যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েও কাজ করছে প্ল্যাটফর্মটি।
ফ্রিডারের হেড অব সাপোর্ট রেজাউল করিম বলেন, এটি শুধু রংপুরের একটি উদ্যোগ নয়; বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে ফেসবুকের মতো প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সহজ নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের রয়েছে বড় ব্যবহারকারীভিত্তি, উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা ও দীর্ঘদিনের অর্জিত আস্থা।
তাঁর মতে, ফ্রিডারকে এগিয়ে নিতে হলে ব্যবহারকারীদের আস্থা ধরে রাখার পাশাপাশি প্রযুক্তির নিয়মিত উন্নয়ন, তথ্যের নিরাপত্তা, মানসম্মত কনটেন্ট ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
.jpeg)
ফ্রিডারের মার্কেটিং প্রধান বাদশা আলম জানান, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের ফলে প্ল্যাটফর্মটির পরিচিতি বেড়েছে। এখন নতুন ও পুরোনো ব্যবহারকারীদের জন্য সেবার মান উন্নত করা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যবহারকারীদের বর্তমান আগ্রহকে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদে পরিণত করতে পরিকল্পিত প্রচারণা ও উন্নত সেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফ্রিডারে ১৫০ টাকায় প্রোফাইল ভেরিফিকেশন এবং ৩০০ টাকায় পেজ ভেরিফিকেশনের সুবিধা রয়েছে। এ ছাড়া নামমাত্র খরচে পোস্ট প্রমোট ও বিজ্ঞাপন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, এক হাজার ফলোয়ার হলেই মনিটাইজেশনের সুযোগ পাওয়া যায়। এসব সুবিধার মাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারী, কনটেন্ট নির্মাতা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নিজেদের পরিচিতি বাড়ানোর পাশাপাশি অনলাইনে আয়ের সুযোগ পেতে পারেন। তবে এসব সুবিধার শর্ত, যোগ্যতা ও অর্থপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা প্রয়োজন।
ফ্রিডারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা সহজ করা, নিরাপত্তা জোরদার এবং নতুন সুবিধা যুক্ত করা। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশীয় উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। দেশীয় প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞাপন ও অনলাইন ব্যবসার পরিসর বাড়লে তা দেশের প্রযুক্তি খাতের বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবায়নে ব্যবহারকারীদের আস্থা, তথ্যের সুরক্ষা, কার্যকর কনটেন্ট ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই ব্যবসায়িক মডেল গুরুত্বপূর্ণ হবে।
রংপুর নগরীর স্টাফ কোয়ার্টার-সংলগ্ন গঙ্গাচড়া সড়কের পাশে ভাড়া করা একটি ভবনে ফ্রিডারের প্রধান কার্যালয়। উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ১৫ জন শিক্ষিত বেকারের কর্মসংস্থান হয়েছে।
রংপুর থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির ধারাকে কীভাবে টেকসই অগ্রগতিতে রূপ দেওয়া যায়। নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে হলে সক্রিয় ব্যবহারকারীর অংশগ্রহণ, নিরাপদ সেবা, প্রযুক্তিগত স্থিতিশীলতা ও ব্যবহারকারীদের আস্থা ধরে রাখার সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। পরিকল্পিত উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ফ্রিডার দেশীয় প্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরির সুযোগ পেতে পারে।