২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই মামলায় কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা-কে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। মামলার চার আসামিই পলাতক রয়েছেন।
রায়ে যা বলা হয়েছে
রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, প্রথম অভিযোগের ১ থেকে ৬ নম্বর কাউন্টে দোষী সাব্যস্ত করে মাহবুবউল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই অভিযোগের পাশাপাশি দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযোগে তাঁকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অন্য তিন আসামি সদর উদ্দিন খান, আসগর আলী ও আতাউর রহমান আতা-কে প্রথম অভিযোগের ১ থেকে ৬ নম্বর কাউন্টে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযোগে তাঁদের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া চতুর্থ ও পঞ্চম অভিযোগ একত্রে বিবেচনা করে চার আসামিকেই যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে রায়ের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
রায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
মামলার অভিযোগ
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ মামলাটির তদন্ত শুরু হয়। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়। পরে ৬ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৫, ১৭ ও ৩০ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের সময় উপস্থিত থেকে তাঁর আন্দোলন দমনের অবস্থানকে সমর্থন করেন হানিফ। একই বছরের ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে আখ্যায়িত করে তাঁদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নে উসকানি ও সহায়তা দেওয়ার অভিযোগও আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, হানিফের নির্দেশে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে সদর উদ্দিন খান, আসগর আলী, আতাউর রহমান আতা এবং দলের অন্য নেতারা বৈঠক করেন। সেখানে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের গুলিতে ছয়জন নিহত হন। তাঁরা হলেন আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, বাবুল ফরাজী ও ইউসুফ শেখ।
যেভাবে এগিয়েছে বিচার
২০২৫ সালের ২ নভেম্বর চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। একই বছরের ৮ ডিসেম্বর সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয় এবং সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।
চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। মামলায় মোট ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়। ১০ জুন যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। পরে প্রসিকিউশন অতিরিক্ত সাক্ষ্য ও নথিপত্র উপস্থাপন করলে উভয় পক্ষকে আবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়।
গত ৭ অক্টোবর পুনরায় যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। পরে ২৭ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন। সেই অনুযায়ী বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করা হয়।