রাত গভীর। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে মানুষ যখন একটু স্বস্তির ঘুমের অপেক্ষায়, ঠিক তখনই হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। থেমে যায় ফ্যান, মুহূর্তেই ঘর ডুবে যায় অন্ধকারে। বাইরে রাতের নীরবতা নামলেও পাকা ভবনের দেয়াল ও ছাদে জমে থাকা দিনের তাপ তখন ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় ভ্যাপসা গরম, অস্বস্তি আর ঘুমহীন রাত।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে তাই কেবল একটি নাগরিক সেবা ব্যাহত হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, বিশ্রাম, কর্মক্ষমতা এবং জনস্বাস্থ্যের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন খেটে খাওয়া মানুষ। সারাদিন রোদে-ঘামে পরিশ্রমের পর একজন শ্রমজীবী মানুষের পরদিনের কর্মক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করে রাতের পর্যাপ্ত ও শান্তিপূর্ণ ঘুমের ওপর। কিন্তু গভীর রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে সেই বিশ্রামটুকুও নষ্ট হয়। একইভাবে অসুস্থ, বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য অতিরিক্ত গরম ও ঘুমের ব্যাঘাত আরও কষ্টকর হয়ে ওঠে।
সরকারি হাসপাতালের রোগীদের কথাও কি আমরা গভীর রাতে ভেবে দেখি? বিদ্যুৎহীন একটি গরম রাত একজন সুস্থ মানুষের কাছে যেমন অস্বস্তিকর, একজন অসুস্থ মানুষের জন্য তা হয়ে উঠতে পারে আরও কঠিন অভিজ্ঞতা। চিকিৎসাধীন রোগীর স্বাভাবিক বিশ্রাম ব্যাহত হলে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব শিশুদের ওপরও কম নয়। একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত এবং নির্বিঘ্ন ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বারবার ঘুমের ব্যাঘাত হলে সকালে স্কুলে যেতে অনীহা, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগের ঘাটতি কিংবা পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নাগরিক। তাই তাদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও হৃদরোগসহ নানা জটিলতায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। এসব রোগীর জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও স্বাভাবিক ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ গভীর রাতে বারবার লোডশেডিং হলে তাদের শারীরিক কষ্ট আরও বেড়ে যেতে পারে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহকে শুধু অর্থনীতি, শিল্প বা উৎপাদনের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ও মানুষের জীবনযাত্রার প্রশ্নও গভীরভাবে জড়িত।
নাগরিকরা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেন। একটি সেবা গ্রহণের বিনিময়ে অর্থ দিতে হলে সেই সেবা যথাসম্ভব নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি, জ্বালানি সংকট, কারিগরি ত্রুটি কিংবা জাতীয় পর্যায়ের নানা সংকট থাকতে পারে। কিন্তু এসব বাস্তবতাকে অব্যবস্থাপনা, গাফিলতি, অনিয়ম বা দুর্নীতির আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৫৩ ধারায় সেবা প্রদানকারীর অবহেলা বা দায়িত্বহীনতার কারণে সেবা গ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য বা জীবনহানি ঘটলে বা ঘটার উপক্রম হলে শাস্তির বিধান রয়েছে। অর্থাৎ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা কেবল নৈতিক দায় নয়; নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এর আইনি দায়ও রয়েছে।
রাষ্ট্র নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সংকটের সময়েই দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। জনগণের দুর্ভোগ যদি অব্যবস্থাপনা বা অনিয়মের কারণে দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে শুধু মানুষের কষ্টই বাড়ে না, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উন্নয়নকে শুধু বড় বড় প্রকল্প, সড়ক, সেতু কিংবা অবকাঠামোর হিসাব দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একজন শ্রমিকের শান্তির ঘুম, একজন রোগীর স্বস্তি, একজন শিক্ষার্থীর নির্বিঘ্ন পড়াশোনা এবং একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
তাই প্রশ্নটি শুধু—‘বিদ্যুৎ কখন আসবে?’—এখানেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, একজন নাগরিক তার প্রাপ্য সেবা, নিরাপত্তা ও স্বস্তি থেকে আর কতদিন বঞ্চিত থাকবে?
একটি বিদ্যুৎহীন রাত কারও কাছে সাময়িক অস্বস্তি, আবার কারও কাছে তা অসুস্থতা কিংবা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা কেবল নাগরিক সেবা প্রদানের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিদ্যুৎ শুধু আলো জ্বালায় না—মানুষের স্বাভাবিক জীবনও সচল রাখে। তাই বিদ্যুৎহীনতার অন্ধকারকে শুধু অন্ধকার হিসেবে নয়, জনস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য সংকেত হিসেবেও দেখতে হবে।