শিরোনাম
কে এই শেখ নূর?

কানাডায় সালমানের শ্বশুরের পরিবারের কোটি কোটি টাকার লেনদেনের নথি

কানাডায় সালমানের শ্বশুরের পরিবারের কোটি কোটি টাকার লেনদেনের নথি

কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নূর ইসলাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কানাডার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৪৩ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট। এক দশকে কানাডায় ৫ মিলিয়নের বেশি কানাডিয়ান ডলারের লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করে পরিবারের নয় সদস্যের কর ফাঁকির অনুসন্ধান শুরু করেছে সংস্থা দুটি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও চাওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকায় নিউ গিনি প্রপার্টিজের প্রকল্প এলাকায় নিজের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় বিএনপির লোকজনকে দায়ী করে ফেসবুক লাইভে বক্তব্য দেন সালমান মুক্তাদির। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার তাঁর ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এর মধ্যেই তাঁর শ্বশুর শেখ নূর ইসলাম ও পরিবারের সদস্যদের বিদেশে আর্থিক লেনদেন এবং কর নথি নিয়ে অনুসন্ধানের তথ্য সামনে এসেছে।

তবে সালমান মুক্তাদিরের সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে তাঁর শ্বশুরের পরিবারের কর অনুসন্ধানের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানিয়েছে সিআইসি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এটি সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের নিয়মিত কার্যক্রম। গত ২০ জুন নূর ইসলামের পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এর আগে এপ্রিলে বিএফআইইউর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আয়কর নথিতে সম্পদের অসংগতি

অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শেখ নূর ইসলামের আয়কর নথিতে সম্পদ ও আয়ের বিবরণে অসংগতি পাওয়া গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তিনি রেমিট্যান্স হিসেবে ৯৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা দেশে আনার তথ্য দেখিয়েছেন। ওই অর্থবছরে তাঁর সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১০৪ কোটি টাকা এবং আয়কর পরিশোধ করেছেন ৬৯ লাখ টাকা।

এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তাঁর সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল ১৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ওই বছর তিনি পাঁচ কোটি টাকা আয়কর দিয়েছিলেন। দুই অর্থবছরের সম্পদের পরিমাণ ও কর পরিশোধের তথ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

আয়কর আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশি করদাতাদের বিদেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বিবরণ আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করতে হয়। বিদেশে সম্পদ থাকার তথ্য গোপন করা হলে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির ন্যায্য বাজারমূল্যের সমপরিমাণ জরিমানার বিধান রয়েছে। বকেয়া জরিমানা আদায়ে কর কর্তৃপক্ষ দেশে বা বিদেশে থাকা সম্পত্তি ক্রোক, বাজেয়াপ্ত বা বিক্রির ব্যবস্থা নিতে পারে। প্রয়োজনে দেশে-বিদেশে তদন্ত ও তথ্য সংগ্রহের আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া যায়।

দেশে ১৪টি কোম্পানির সঙ্গে সম্পৃক্ততা

আয়কর নথির তথ্য অনুযায়ী, শেখ নূর ইসলাম বাংলাদেশে ১৪টি কোম্পানির পরিচালক। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ডমিনোজ পিজা, ফুওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড, এসআই ট্রাভেলস অ্যান্ড কার্গো সার্ভিসেস, ইস্টার্ন হোটেল অ্যান্ড বার, টাভার্স সাপ্লায়ার্স, রেডিও মাসালা, পল বেকারি অ্যান্ড ক্যাফে রেস্টুরেন্ট, ডমিনাস অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি, স্পাইস টেলিভিশন, কয়লা পাব, স্টারবার ক্যাফে, ফুওয়াং ডমিনোজ প্রোপার্টিজ, স্পাইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট এবং টিম হর্টনস লিমিটেড। কৃষি খাতেও তাঁর বিনিয়োগ রয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশে কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক হিসেবে শেখ নূর ইসলাম, তাঁর স্ত্রী শিলা ইসলাম ও মেয়ে তাসনিম ইসলামের নাম রয়েছে।

কানাডায় এক দশকে ১৬৫টি লেনদেন

অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শেখ নূর ইসলাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কানাডার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৫ মিলিয়নের বেশি কানাডিয়ান ডলারের লেনদেন হয়েছে। এ সময়ে বিভিন্ন ধরনের ১৬৫টি আর্থিক লেনদেনের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।

এসব লেনদেনের মধ্যে রয়েছে ১৭টি সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন, দুটি ব্যর্থ বা চেষ্টা করা সন্দেহজনক লেনদেন, ১১৮টি বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন, ২৬টি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার এবং দুটি আন্তসীমান্ত মুদ্রা লেনদেন প্রতিবেদন। কানাডিয়ান ডলারের পাশাপাশি ব্রিটিশ পাউন্ড, মার্কিন ডলার, সিঙ্গাপুরি ডলার ও থাই বাথেও লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় শেখ নূর ইসলামের ব্যবসা রয়েছে। তিনি দেশটিতে ‘জুম জুম পিজা’র স্বত্বাধিকারী। তাঁর স্ত্রী শিলা ইসলাম ডমিনোজ পিজার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের মেয়ে দিশা ইসলাম সান লাইফের ইনভেস্টমেন্ট কনসালট্যান্ট এবং তাসনিম ইসলাম ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধিত।

কানাডার একাধিক ব্যাংকে যৌথ হিসাব

সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, শেখ নূর ইসলামের পরিবারের সদস্যরা কানাডার বিভিন্ন ব্যাংকে একক ও যৌথ নামে একাধিক হিসাব পরিচালনা করেন।

দ্য টরন্টো-ডোমিনিয়ন (টিডি) ব্যাংকে শেখ নূর ইসলাম, শিলা ইসলাম ও দিশা ইসলামের নামে একটি যৌথ ব্যক্তিগত হিসাব রয়েছে। ব্যাংক অব মন্ট্রিলে শিলা ইসলাম ও দিশা ইসলামের যৌথ হিসাব এবং শিলা ইসলাম ও তাসনিম ইসলামের নামে একাধিক যৌথ হিসাব সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া টিডি ব্যাংকে দিশা ইসলাম ও তাসনিম ইসলামের নামেও যৌথ হিসাব পরিচালিত হচ্ছে। হোম ট্রাস্ট কোম্পানিতে শিলা ইসলামের নামে একটি মর্টগেজ হিসাবের তথ্যও পাওয়া গেছে।

কর্মকর্তাদের দাবি, আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও শেখ নূর ইসলাম তাঁর কানাডার নাগরিকত্ব ও সেখানে থাকা স্থাবর সম্পদের তথ্য আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করেননি। কানাডায় অর্থ স্থানান্তরের দলিলও রিটার্নের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও অর্থ স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রাপ্ত নথি বিশ্লেষণে কানাডায় অর্থ স্থানান্তর ও সম্পদ অর্জনের বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ব্যাংক হিসাবের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও অর্থের উৎস যাচাইয়ের পরই কর ফাঁকি বা অর্থ পাচারের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর