ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশালের ছয়টি সংসদীয় আসনে ৪৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধীতার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধেই বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের আমলের কম-বেশি রাজনৈতিক মামলা রয়েছে। তবে সবাইকে পেছনে ফেলে বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু দুর্নীতি আর কর খেলাপি মামলার শীর্ষে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি এলাকায় চাউর হওয়ার পর এনিয়ে দুই উপজেলার সাধারণ ভোটারদের মধ্যে সমালোচনার ঝড় বইছে। নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি থেকে ক্লীন ইমেজের প্রার্থী দেয়ার ঘোষনা দিলেও বরিশাল-২ আসনে দুর্নীতি আর কর ফাঁকির একাধিক মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেয়ায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-২ আসন থেকে প্রতিদ্বন্ধীতার জন্য ১০ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এসব প্রার্থীরা মনোনয়নপত্রের সাথে হলফনামা সংযুক্ত করেছেন। বিএনপি প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমেদের হলফনামা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে। যারমধ্যে পাঁচটি মামলাই দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে দায়ের হওয়া। যা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আয়কর ফাঁকির একটি মামলা রয়েছে। যা বর্তমানে উচ্চ আদালতে স্থগিত রয়েছে। এছাড়াও ইতিপূর্বে তার বিরুদ্ধে আটটি মামলা হয়েছিলো। যার তিনটিই আয়কর ফাঁকির মামলা। যা বর্তমানে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে তিনি হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। অপরদিকে ৩ জানুয়ারি মনোনয়ন বাছাইয়ে বরিশাল-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুর মনোনয়নপত্র স্থগিত করেছেন জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা। একটি সরকারি সংস্থার তথ্যমতে, আয়কর সংক্রান্ত জটিলতার কারনে তার মনোনয়নপত্র স্থগিত করা হয়েছে। করখেলাপীতে শ্রেষ্ট : বরিশাল-২ আসনে মনোনয়নপত্র জমাদানকারী ১০ জন প্রার্থীর মধ্যে কেহই কর খেলাপি মামলায় অভিযুক্ত না থাকলেও তিনি (সরফুদ্দিন) কর খেলাপি মামলায় সবার উপরে অবস্থান করছেন। ঢাকা কর অঞ্চল-৭ এর সার্কেল-১৩৩ কার্যালয় সূত্রে পাওয়া ২০১৪ সালের এক নথিতে জানা গেছে, করবর্ষ ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০০৭-২০০৮ করবর্ষ পর্যন্ত তার কাছে করদাবী ছিলো ৩৮ কোটি ৯১ লাখ ৬১ হাজার ৩৫২ টাকা। জরিমানা হয় ১৬৮ কোটি ৩৮ লাখ ১৩ হাজার ২৩৫ টাকা। তার কাছে মোট দাবী ২০৭ কোটি ২৯ লাখ ৭৪ হাজার ৫৮৭ টাকা। এবিষয়ে বরিশাল-২ আসনের একাধিক প্রার্থীরা বলেন, বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুর্নিতী ও কর ফাঁকির মামলা সংক্রান্ত বেশ কিছু বিষয় রয়েছে। সরকারের কোটি কোটি টাকা করখেলাপি হয়েও যদি নির্বাচনের সুযোগ পায় তাহলে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকেনা। এবিষয়ে জানতে বরিশাল-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুর হলফনামায় দেওয়া (০১৭১১-৬৩২৫০৬) মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করা হলেও তাকে না পাওয়ায় কোন বক্তব্য নেওয়া যায়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রথম ধাপে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল ও স্থগিত এরমধ্যে নগরীর আলোচিত স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক লিটন সিকদার লিটু (৩২) হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মো. রিয়াজ মাহমুদ খান মিল্টন (৪০) উপস্থিতিতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রাজিব আহসানের সাথে সম্প্রতি আদালত থেকে জামিনে আসা লিটু হত্যা মামলার ৫ নং আসামি মিল্টনকে প্রকাশ্যে দেখা গেছে। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) বেলা ১১টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের যাচাই-বাছাই কার্যক্রমের সময় এ দৃশ্য ফুটে উঠে। সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তাদের যাচাই বাছাইয়ে- বরিশাল-৪, বরিশাল-৫ ও বরিশাল-৬ আসনের মোট ২১ জন প্রার্থীর জমা দেওয়া মনোনয়নপত্র যাচাই করা হয়। দুই প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল ও দুইজনের মনোনয়ন স্থগিত ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। বাকি ১৭ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। মনোনয়ন বাতিল হওয়া দুই প্রার্থীর মধ্যে বরিশাল-৫ (সদর) আসনে খেলাফত মজলিশের প্রার্থী এ কে এম মাহবুব আলম মনোনয়নপত্রের ২০ নম্বর পাতায় স্বাক্ষর না করা এবং ২১ নম্বর পাতা পূরণ না করায় তার মনোনয়ন বাতিল হয়। একই আসনে এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোটার তালিকা ও প্রস্তাবক-সমর্থকদের তথ্য সঠিক না থাকায় তার মনোনয়নপত্রও বাতিল ঘোষণা করা হয়। আবার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতির কারণে দুটি মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে আয়কর রিটার্ন সনদ না থাকা, ১০ (বি) ফরম সংযুক্ত না করা এবং ছবি সত্যায়িত না থাকায় বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনের মুসলিম লীগ প্রার্থী আব্দুল কুদ্দুসের মনোনয়ন স্থগিত করা হয়। এছাড়া হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকা এবং অঙ্গীকারনামায় অসংগতির কারণে, বরিশাল-৫ আসনের বাসদ প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তীর মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখা হয়েছে। শনিবার (৩ জানুয়ারি) বরিশাল-১, বরিশাল-২ ও বরিশাল-৩ সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক খাইরুল আলম সুমন বলেন, ‘প্রথম ধাপে তিনটি সংসদীয় আসনের মনোনয়ন যাচাই করা হয়েছে। এতে দুটি মনোনয়ন বাতিল ও দুটি স্থগিত করা হয়েছে।’ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও জানান তিনি। বরিশাল জেলার ৬টি সংসদীয় আসনে মোট ৬২ জন প্রার্থী মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। এর মধ্যে ৪৮ জন প্রার্থী নির্ধারিত সময়ে তাদের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই সন্ধ্যায় নগরীর কাশিপুর বিল্ববাড়ি এলাকায় লোমহর্ষক সন্ত্রাসী তাণ্ডব চালিয়ে লিটু কে প্রকাশ্যে পিটিয়ে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পরের দিন ১ আগস্ট বিকেলে বরিশালের এয়ারপোর্ট থানায় নামধারী ৬১ জন ও অজ্ঞাতনামা ১৫০/২০০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন নিহত লিটুর বোন ঘটনাস্থলে আহত মোসা. মুন্নি (৩৫)। ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট, বেলা সাড়ে তিনটায় মিল্টনকে নগরীর কাউনিয়া বাগান বাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করে বরিশাল এয়ারপোর্ট থানা ও ডিবি পুলিশ। মিল্টন নিহত লিটুর ডান হাত কেটে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরে অন্যান্য আসামিরা পিটিয়ে কুপিয়ে জখম করে বলে বাদি এজাহারে উল্লেখ করেন। ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-দপ্তর সম্পাদক মোঃ ওসমান গনির প্রেরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল বরিশাল মহানগর শাখার যুগ্ম-আহ্বায়ক মো: রিয়াজ খান মিল্টন (৫ নং আসামি) কে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।